এনামুল হক, ধর্মপাশা
ক্রমশ কমছে বন্যার পানি। সেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানা দুর্ভোগ। এ দুর্ভোগ বন্যা কবলিত হাওরাঞ্চলের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে এক চরম সংকটের সৃষ্টি করেছে। এ সংকট খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের পাশাপাশি চিকিৎসারও। এই সময়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। এ সংকটময় মুহুর্তে যেখানে দুবেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই দায় সেখানে এসব রোগের চিকিৎসা বন্যার্তদের কাছে অনেকটাই যেন বিলাসিতার মতো। অসুস্থ্য হলেও রোগীকে হাসপাতেল নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখানে কম। এরই মধ্যে ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে ডায়রিয়ায় তিনজনের মৃত্যু (হাসপাতালে পৌঁছার আগে) ও কয়েক শতাধিক ব্যক্তি ডায়রিয়া আক্রান্ত হওয়ার খবর সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সুহৃদদের ব্যতিত করে। ফলে পানিবাহিত রোগ যাতে মহামারি আকার ধারণ করতে না পারে সেজন্য মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সমকাল সুহৃদের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ৭ দিনব্যাপী (২৮ জুন-৪ জুলাই) ফ্রি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্পের। আর মানবিক এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জল জনপদ নারী ও শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা (জনাশিউস) বাংলাদেশ।
মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন
২৮ জুন বেলা ১১টায় মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রিত বন্যার্তদের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন। সেইভাবে প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়। ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুক্তাদির হোসেনসহ প্রয়োজনীয় অসুধ নিয়ে ধর্মপাশা সুহৃদ সকাল ৯টার মধ্যে বংশীকুন্ডার দিকে রওয়ানা দেয়। কিন্তু বন্যায় ধর্মপাশা-মধ্যনগর সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ট্রাক আটকে যাওয়ায় সুহৃদেরা পড়েন বিপাকে। তাদের সিএনজি আর সামনে এগুতে পারেনি। ফলে তাঁদেরকে অসুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে গলইখালী পর্যন্ত যেতে হয়। সেখানে আগে থেকে সুহৃদের জন্য একটি ট্রলার রিজার্ভ করে রাখা হয়েছিল। তারপর ঘন্টাখানেক সেই ট্রলারে চড়ে বংশীকুন্ডা পৌঁছাতে হয়। যাতায়াতের দুরাবস্থার কারণে ঘন্টাখানেক সময় দেরিতে পৌঁছায় সুহৃদের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়। মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন সহযোগি সংগঠন জনপদ নারী ও শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা (জনাশিউস) বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সাজেদা আহমদ। এ উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় ধর্মপাশা সুহৃদের সভাপতি সুভাস চন্দ্র সরকারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ। মেডিকেল ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়কারী নিউটন সরকারের পরিচালনায় প্রধান আলোচক হিসেবে স্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন, ডা. মুক্তাদির হোসেন। এ সময় অন্যানের মাঝে বক্তব্য দেন সমকাল প্রতিনিধি এনামুল হক, বংশীকুন্ডা কলেজের প্রভাষক সোনিয়া খানম, দেলোয়ার হোসেন, পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন, ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম প্রমুখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষক, সমাজসেবক, পল্লী চিকিৎসকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রিত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার মধ্য দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়।
চিকিৎসা কার্যক্রম
চারদিকে অথৈই পানি। এক গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নৌকা বা ট্রলার। একটি নির্দিষ্ট স্থানে চিকিৎসা কার্যক্রম চললে সেখানে এসে চিকিৎসা সেবা নেওয়া দুরুহ ব্যাপার। কারণ সবার কাছে নৌকা বা ট্রলার নেই। সেই চিন্তা থেকে সুহৃদ ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে। সে জন্য একটি ট্রলার ভাড়া করা হয় ৭ দিনের জন্য। যার মাধ্যমে দুইজন করে চিকিৎসক প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে চিকিৎসাসেবা দেন। রোগ অনুযায়ী বিনামূল্যে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় অসুধপত্র। প্রথমদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংহতি প্রকাশ করে চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।
যেসব স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হয়
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদপলমাটি, রংচী, কাউহানী ও ঘাসী, রৌহা, মোহাম্মদ আলীপুর, আলমপুর, চাপাইতি, হামিদপুর চৌরাস্তা, আটাইশা মাচামরদানি ইউনিয়নের কামারগাঁও, সাজদাপুর, নন্দীপাড়া ও মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে বারো শতাধিক মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা ও তাঁদের মাঝে বিনামূল্যে অসুধ বিতরণ করা হয়।
যারা চিকিৎসা দিলেন
ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুক্তাদির হোসেন, ধর্মপাশা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) ডা. মিজানুর রহমান রনি, নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. সৌরভ ঘোষ, ডা. শরিফুল ইসলাম, মুগদা ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডা. মো. মাজহারুল হক, তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক কাজল রায়।
বংশীকুন্ডা গ্রামের বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমি শারীরিকভাবে দুর্বল আর ভীষণ অসুস্থ্য। ৩০ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদরে হাসপাতালের যাওয়ার শক্তি আমার নাই। আশ্রয় থেকেই চিকিৎসা পাবো ভাবিনি।’ রৌহা গ্রামের ইউসুব আলী ও সবুজা খাতুন বাড়িতে বসে চিকিৎসা পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
ডা. মিজানুর রহমান রনি বলেন, ‘মানুষ এখন নিজের জানমাল নিয়েই ব্যস্ত। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর অনেচতনার কারণে অসুস্থ্য হলেও চিকিৎসা নিতে অনেকেই হাসপাতালে যাচ্ছেন না। একজন রোগীকে পেয়েছিলাম যার ব্লাড প্রেসার ছিল ২২০/১১০। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। এখন বন্যা কবলিত মানুষ সবচেয়ে বেশি চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’
ডা. মুক্তাদির হোসেন বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের মানুষ তার খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে যতটা চিন্তিত চিকিৎসার ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকায় হুট করে অসুস্থ হলে অর্থাভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না। কোনো অসুখ হলে ‘কয়েকদিন পর ভাল হয়ে যাবে’- এমন ধারণা থেকে তাঁরা চিকিৎসা কেন্দ্রে যান না। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। আর যখন হাসপাতালে পৌঁছান তখন আমাদের কিছুই করার থাকে না। বন্যা পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতাই পারে আমাদের জীবন বাঁচাতে।’
সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সভাপতি সুভাস চন্দ্র সরকার বলেন, ‘ধর্মপাশায় সমকাল সুহৃদ বঞ্চিত মানুষের পাশে এবং থাকবে।’
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ বলেন, ‘এই মুহুর্তে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সমকাল সুহৃদ সেটি করেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। আর জনাশিউস এ কাজে সম্পৃক্ত হয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে।’
জনপদ নারী ও শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা (জনাশিউস), বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সাজেদা আহমদ বলেন, ‘এই মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার সময় আমি প্রতিদিন সাথে থেকে খুব কাছ থেকে অসহায় মানুষের আকুতি শুনেছি। সমকাল সুহৃদের এই আয়োজনের ফলে অনেক অসহায় রোগী ফ্রি চিকিৎসা পেয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, ‘বন্যা পরবর্তী সময়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’