ইকবাল কাগজী
ইফতেখার আহমেদ খসরু, সুনামগঞ্জের এক সজ্জন প্রবাসী। কিন্তু স্বদেশ তাঁকে ছাড়ে না কখনও। ঘরকলজিকতায় তিনি সর্বদা গ্রস্ত থাকেন। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা জটিলতার চক্করে পড়ে তাঁর মন বড়ো বেশি আনচান করছে। হাজার সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের পীঠে সিন্দুবাদের বেয়াড়া ভূতের মতো চড়ে বসেছে, সম্প্রতি জাতিসংঘে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণানুসারেই চার লক্ষাধিক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা। বিষয়টি খসরুকে ভীষণ আলোড়িত করেছে। বুঝাই যায়, দেশেবিদেশে প্রতিটি বাঙালিই এ নিয়ে কমবেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, কেবল সেইসব জনপ্রতিনিধিরা ছাড়া, যাঁরা রোহিঙ্গাদেরকে নিঃশঙ্কচিত্তে নাগরিকত্ব সনদ দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
পৌরবিপণির একটি দোকানে বসে আলাপচারিতায় মগ্ন ছিলাম, দুজনের সঙ্গে। একজন দোকানী স্বয়ং এবং অন্যজন একজন প্রখ্যাত জনপ্রতিনিধি। দু’এক কথায় বুঝা গেলো, জাতির উর্ধে ইসলামি বিশ্বভ্রাতৃত্বের প্রবল প্রভাবে তাঁরা দু’জনই রোহিঙ্গাদের স্বদেশি করে নিতে নিঃশঙ্কচিত্তে নির্দ্বিধ, এমনকি নাগরিকত্ব প্রদান করার বিপক্ষেও নন। সমাজের ভেতরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চোরা¯্রােতের সঙ্গে মিশে অনেকটা সিয়াসুন্নির মতো বা ফিলিস্তিন ইজরাইলের মতো স্থায়ী বিরোধের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে সে বিবেচনা তাঁদের বোধের মধ্যে লক্ষ্য করা গেলো না। এই একরুখা মানসতার নিহিতার্থ একটাই রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাক তাঁরা তা চান না।
রোহিঙ্গা বিষয়টি যে কোনও সাধারণ কীছু নয়, বরং দেশি ও বিদেশি রাজনীতিক ও আর্থনীতিক স্বার্থলগ্নতার কারণে অনিবার্যভাবেই জটিলকূটিল এবং বাংলাদেশের জন্য একটি দুর্বহ দায়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এ নিয়ে পত্রপত্রিকার লেখালেখি, টকশোর আলোচনা কিংবা ফেইসবুকে দেদার লোখালেখি দেখে তা বুঝতে কারও অসুবিধে হয় না। খসরু লিখেছেন, ‘গত বিশ বৎসরের অধিক সময় ধরে পৃথিবীতে মুসলমান মুসলমানদের মেরে চলেছে, তার জন্য বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ তো দূরের কথা একফোঁটা পানিও পড়তে দেখিনি। নাপাকি দ্বারা এ দেশের গণহত্যা উপাখ্যান নাই বা আনলাম।’ এখানে ‘একফোঁটা পানি’ ও ‘নাপাকি দ্বারা এ দেশের গণহত্যা উপাখ্যান’ বলতে যে যথাক্রমে ‘একফোঁটা চোখের পানি’ ও ‘পাকিস্তানি হানাদার কর্তৃক ১৯৭১-য়ে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি হত্যা’র কথা বলা হয়েছে, সেটা বুঝতে কোনও বেগ পেতে হয় না, বরং সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু এই বক্তব্যে মধ্যে আরও কী যেনো একটি গূঢ়ার্থ প্রচ্ছন্ন আছে বলে মনে হচ্ছে। এবার বৌদ্ধবার্মা কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন নিয়ে ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ’ ব্যাপকাকারে পরিলক্ষিত হচ্ছে, এ প্রবণতাকে প্যান-ইসলামিজমের চর্চার প্রকাশ বলে কেউ কেউ ইঙ্গিত করছেন, যেহেতু এখানে মুসলমান মুসলমানকে নীপিড়ন করেনি, করছে বৌদ্ধরা। আর এই ‘বৌদ্ধ কর্তৃক মুসলিমনিধন’ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা প্রকাশ করছেন। অথচ অভিযোগ আছে, যেসব বাংলাদেশি র্দ্বুৃত্ত নাফ নাদী পার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পথে নদীমধ্যে রোহিঙ্গাদের ইজ্জতসহ শেষ সম্বলটি পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে তারাই রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের প্রতিবাদ মিসিলে শরিক হয়েছে। এবং এরপর নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই মিসিল প্রকারান্তরে প্যান-ইসলামিজমের আদর্শিক তত্ত্বের বাস্তবতাকে কোনওভাবেই নয় বরং আর্থনীতিক স্বার্থকেই প্রতিবিম্ভিত করে।
খসরু প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে বিস্তৃত ও কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রবলভাবে কার্যকর একটি মৌলিক সমস্যার, যে সমস্যাকে বিশ্বমুসলিমভ্রাতৃত্বের অন্তর্দ্বন্দ্ব বলে আখ্যাত করা যায়, প্রসঙ্গের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে হয় এবং সেটি বিদ্যমান রোহিঙ্গা পরিস্থিতির নীরিখে কোনও অর্বাচীন প্রসঙ্গও নয়। প্রসঙ্গটি যে নিতান্ত অর্বাচীন নয়, রীতিমতো প্রাচীন, এবং ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিতকাল থেকে দৃশ্যমান, তার ঐতিহাসিক সাবুদ হাজির করেছেন একজন সালেম কুরাইশি। তিনি প্রবাসী কিনা জানি না। তিনি খসরুর মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবসম্মতভাবে যা বলেছেন, তাঁর সে ইংরেজি ভাষ্যের মর্মার্থ অনেকটা এরকম দাঁড়ায় (ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী), মুসলমান কর্তৃক মুসলমান হত্যার শুরু ইসলামের শুরুর কাল থেকেই। তিনি (কুরাইশি) অতি সংক্ষেপে ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের ফিরিস্তি তুলে দিয়েছেন, যা আজকের বাঙলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতিতে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। হজরত মুহম্মদ (স.)-এর প্রয়াণপরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগের প্রথম খলিফা ব্যতীত বাকি তিন খলিফা আততায়ীর আক্রমণে নিহত হওয়া, পরবর্তী সময়ে হাসান ও হোসেন হত্যা, তা ছাড়া তৎপরবর্তী ইসলামি খিলাফতের যুগে সময়ে সময়ে বিশেষ করে আব্বাসীয় রাজত্বে শিয়া ইমাম, বুদ্ধিজীবী ও সে সম্প্রদায়ের লোকদেরকে নির্বিচারে হত্যার অপ্রিয় প্রসঙ্গ তাঁর (কুরাইশি) মন্তব্যে উঠে এসেছে। এমনকি তিনি ১৯৭১-য়ে তৎকালের পূর্বপাকিস্তানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গটিও এই প্রসঙ্গে উপস্থাপন করতে ভুলে যাননি। প্রশ্ন করেছেন, ‘কী করে আমরা ৭১-কে ভুলে যাই?’ এখানে ‘৭১’ মানে ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ। একদিক থেকে বিবেচনায় যেখানে জনসংখ্যার অনুপাতানুসারে মুসলমান নব্বই শতাংশ হওয়ার কথা। অপর দিক থেকে বিবেচনায় হিন্দুরা, বলতে গেলে, শতভাগ তো দেশ ত্যাগ করে ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। দেশের ভেতরে রয়ে গিয়েছিল কেবল মুসলমানরা। হত্যা করার জন্য তাদেরকেই হাতের কাছে পেয়েছে হানাদার বাহিনী। কুরাইশি সর্বশেষে এও বলেছেন, এইসব হত্যা গণহত্যার জন্য ইসলাম দায়ী নয়। তিনি স্পষ্ট করে না বললেও, অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় না যে, এই সব হত্যাযজ্ঞ প্রকৃতপ্রস্তাবে, তিনি যেমন বলেছেন, ধর্মীয় কোনও কারণে সংঘটিত হয়নি, সেটা যেমন সত্য তেমনি সত্য যা তিনি উল্লেখ করেননি, সেটি হচ্ছে, এই সব হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে সুনির্দিষ্ট আর্থনীতিক ও রাজনীতিক কারণে। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, মুসলমান কর্র্তক মুসলমান হত্যা কোনও নতুন বিষয় নয়, সেটা একটি পুরনো প্রসঙ্গ এবং সেটি এখনও কোনও না কোনওরূপে অব্যাহত আছে তো বটেই। আসলে এটি একটি ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ। ইসলামের অবির্ভাবকাল থেকেই এমন হত্যাযজ্ঞ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে বিদ্যমান ছিল এবং এখনও আছে। এমন ঐতিহাসিক বাস্তবতার নীরিখে, ধরে নেওয়া যায় যে, খসরু তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে প্রকারান্তরে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ, এখানে বোধ করি বলা ভাল মুসলমানরা, পৃথীবির কোথাও মুসলমান যখন মুসলমানকে হত্যা করে তখন প্রতিবাদ মুখর হন না, কিন্তু অমুসলিম কর্তৃক মুসলিম নিধন সংঘটিত হলে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন এবং প্রকারান্তরে জিহাদ করতে বদ্ধপরিকর হতে পারতে পিছপা হন না। ফলে এই মন্তব্যের নিহিতার্থ একটি প্রশ্নাকারে প্রকাশ পায় এবং সে প্রশ্নটি বোধ করি এই রকম যে, মুসলমান কর্তৃক মুসলমান নিধনে বাংলাদেশ যদিÑ বলতে গেলেÑ নির্বিকার স্থবিরতা প্রকাশ করতে পারে, তবে বার্মাবৌদ্ধ কর্তৃক আরাকানের মুসলমাননিধনে কেন জড়ভরত হয়ে থাকবে না? একবার নির্বিকার ও অন্যবার ‘সর্বিকার’গ্রস্ততার প্রকাশ, অথচ দু’ক্ষেত্রেই মুসলমাননিধন সংঘটিত হয়েছে, হোক না তা মুসলমান কিংবা অমুসলমান কর্তৃক। রোহিঙ্গানিধন সমস্যাটি ৭১-য়ে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে বিবেচনায় একটি ক্ষেত্রে পৃথক বৈশিষ্ট্যের, সেটি হলো ৭১-য়ের গণহত্যা মুসলমান কর্তৃক মুসলমানকে হত্যা এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরে নাগরিকদের, এই নাগরিকরাও অবশ্য বরং ‘একটু বেশি করে’ মুসলমান, এক অংশের দ্বারা আরেক অংশকে নিধনের প্রচেষ্টা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মুসলমান কর্তৃক মুসলমান নিধনের বৈশিষ্ট্যটি গড়হাজির, এখানে বৌদ্ধরা মুসলমানদের হত্যা করছে এবং ১৯৮২ সালে আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে, যাতে বিশ্ববাসীর কাছে আইনত রোহিঙ্গাদেরকে অন্যদেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিপন্ন করা যায় এবং এখন ব্যাপারটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা যখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছি তখন এতদিন ধরে মায়ানমার যা (রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি) পতিপন্ন করতে চাইছে প্রকারান্তরে যেনো সেই দাবীর স্বীকৃতি দেওয়ার ফাঁদে পা রাখছি। বলতেই হবে, বিষয়টা সত্যি কেবল চমৎকার নয় অভিনবও বটে।
আসলে মুসলমানদের, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলমানদের, মুসলিমনিধন নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে এই দ্বিবিধ আচরণের ব্যাখ্যা কী? সত্যিকার অর্থে এইরূপ আচরণের মধ্যে কি কোনও নিগূঢ়ার্থ নিহিত আছে? এর অর্থ কি এই যে, মুসলমান কর্তৃক মুসলমান নিহত হলে নিহত সে মুসলমান মুসলমানিতের¡ গুরুত্ব এমন পরিমাণে হারায় যে, তাকে নিয়ে প্রতিবাদ করার মতো কোনও জরুরৎও অবশিষ্ট থাকে না এবং বিপরীতে অমুসলমান কর্তৃক মুসলমান নিহত হলে সে মুসলমান মুসলমানিত্বের দিক থেকে এতোটাই অধিক গুরুত্ববহ হয়ে উঠে যে, তাকে নিয়ে জেহাদ করার মতো জরুরৎ সৃষ্টি হয়। বিশ্বজুড়া মুসলমানদের মধ্যে এমন প্রপঞ্চ তৈরি হওয়ার কি কোনও সঙ্গত কারণ আছে, যে কারণে মায়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গানিধন ও বিতাড়ন নিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানরা যতোটা দরকার নয় তারচেয়ে বেশি পরিমাণে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন? এর একটি কারণ বোধ করি বিশ্বজুড়া মুসলমানের মধ্যে ‘প্যান-ইসলামিজম’-য়ের তীব্র উপস্থিতি, যেখানে আর্থিক স্বার্থবোধ থেকে ধর্মবোধ প্রাধান্য লাভ করে বড়ো মাপে, প্রকারান্তরে আর্থনীতিক কিংবা নিছক রাজনীতিক প্রপঞ্চকে ধর্মীয় প্রপঞ্চের পর্দা পরানো হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নিছক পর্দা পরানোর কারণে প্রপঞ্চটির অন্তঃসার মোটেও বদলে যায় না। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের বিষয়টিকে যতই ধর্ম বা জাতিগত নীপীড়ন ইত্যাদির চাদর পরানো হোক না কেন আসলে বিষয়টি আর্থনীতিক, রোহিঙ্গাদের উৎখাত করে রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইনে বৃহৎ ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে তোলা ভিন্ন আর কীছু নয় (এমনকি এখানে সম্মিলিত সামরিক ঘাঁটি গড়ে উঠলেও অবাক হওয়া কীছু থাকবে না)। আর তার সঙ্গে চীন-রাশিয়া-ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়ানো আছে। মায়ানমারের সঙ্গে এই তিন রাষ্ট্রশক্তি মিলে এই নীপিড়নের ঘটনাটি বাস্তবায়িত করেছে এবং বাংলাদেশের পীঠে চাপিয়ে দিয়েছে রাখাইন থেকে উৎখাতকৃত রোহিঙ্গা নামক এক বিশাল জনসংখ্যার ভূত। এটি ¯্রফে একটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিক তঞ্চকতা, যার মর্মার্থ একটাই, বাংলাদেশের উন্নয়নকে থামিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করা। এই ভূতকে পীঠ থেকে নামানোর মন্ত্র যেমন জাতিসংঘ জানে না, তেমনি বাংলাদেশ থেকে প্যান-ইসলামিজমের আদর্শিক আওয়াজ তোলে বা আন্দেলনের প্যান-ইসলামি অভিমুখকে শাণিত করে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান আপাতত সম্ভব নয়, যদিও হয়তোবা অন্যকোনও দলীয় কিংবা কোনও বিশেষ শ্রেণির সংকীর্ণ স্বার্থোদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। ‘মুসলমান মুসলমানদের মেরে চলেছে, তার জন্য বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ তো দূরের কথা একফোঁটা পানিও পড়তে দেখিনি।’ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির বর্তমান জটিলতা নিরসনের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এই বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু কোনও বিশেষ দল বা সম্প্রদায় থাকতেই পারে, যাঁরা রোহিঙ্গা বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে স্বদলীয় স্বর্থসিদ্ধিতে নিরত আছেন, কিন্তু সেটা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের রাজনীতিক ও কূটনীতিক বিবেচনায় কোনও যুক্তিসঙ্গত চর্চা নয়, যতোটা স্বাপ্নিক কবি আল্লামা ইকবালের মতো প্যান-ইসলামিজমের চর্চা। তিনি সগৌরবে বলেছিলেন, ‘মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতন হ্যায় সারা জাহান হামারা।’ কিন্তু বাস্তবে সারা পৃথিবী এখনও ইকবাল কথিত ‘ওয়াতন’ হয়ে উঠেনি, উল্টো মুসলিম ‘ওয়াতন’ অধ্যূষিত মধ্যপ্রাচ্যের তৈলার্জিত অর্থ বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণে ব্যয়িত না হয়ে বিভিন্ন দেশে জঙ্গিসন্ত্রাস বিস্তার ও পুষ্টকরণের লক্ষ্যে ব্যয়িত হচ্ছে, যাতে করে দেশে দেশে অশান্তি সৃষ্টি হয় বটে ইসলামের লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। ৭১-য়ে মুক্তিযুদ্ধে তারা পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করে প্রকারান্তরে ৩০ লক্ষ মুসলিমধিনকে সমর্থন করে। বিশ্বব্যাপী এই বাস্তবতাই প্রকৃত পক্ষে প্যান-ইসলামিজমের তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে প্রতিপন্ন করুক বা না করুক প্রকৃতপ্রস্তাবে কার্যকরিতাকে প্রতিপন্ন করে না।
‘প্যান ইসলামিজম’ বলতে কী বুঝায়? এমন একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর অর্থ কী বিশ্বজুড়া মুসলমানদের ঐক্য? অর্থাৎ বিশ্বমুসলিমভ্রাতৃত্ব? এই শব্দটির এমন বঙ্গায়ন হওয়া বোধ করি অসঙ্গত হবে না, তার সংজ্ঞাথর্টা যা-ই হোক। একজন ‘প্যান ইসলামিজম’-য়ের সংজ্ঞার্থ করেছেন, জাতির পরিচয় ডিঙিয়ে ইসলামের যে বন্ধন। এমনটা হতে পারে, ভাবাদর্শিক বিবেচনায় সেটা একেবারে অসম্ভব কীছু নয়। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছেন, ‘যদিও প্যান-ইসলামের (জাতির পরিচয় ডিঙিয়ে ইসলামের যে বন্ধন) একটা শক্তি আছে, তবু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইসলামি দেশগুলি নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে কথনও দ্বিধা করে না, যেমন ইরান-ইরাক, ইরাক-কুয়েত, আফগানিস্তানের বিভিন্ন বিবদমান গোষ্ঠী। এছাড়া, এমন নয় যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যাচার হলে অন্য জায়গার মুসলমানেরা সে বিষয়ে প্রতিবাদ মুখর হয়Ñ যেমন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সার্বরা যদিও বসনিয়ার মুসলমানদের গণহত্যা করেছে, বাকি মুসলিম দুনিয়ায় বিশেষ হেলদোল দেখা যায়নি।’ (তথাগত রায়, আমেরিকা কি এখন পৃথিবীর নিয়ন্তা?, দেশ, ৬৯ বর্ষ ১৩ সংখ্যা, ১৮ মে ২০০২, পৃষ্ঠা : ২৯।) লেখক তথাগত রায়-য়ের এই মন্তব্য সম্পূর্ণ সত্য যদিও না হয়, একেবারে যে মিথ্যা নয়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এমনিতে তিনি বিশ্বজুড়া ‘প্যান-ইসলামিজম’-য়ের শক্তিকে একটি ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু স্বীকার করে নিয়ে সেটার শক্তির অসারতার প্রমাণ হাজির করেছেন এবং সার্বিক বিবেচনায় এটা একটি জ্বাজল্যমান সত্য যে, মুসলিম বিশ্বজুড়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বাস্তবতা ও সেসব ঘটনা নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার সারাৎসার বিবেচনায় লেখকের মতের পক্ষেই পাল্লা ভারি হয়ে উঠে এবং এই সত্য প্রতিভাত হয় যে, প্যান-ইসলামিজমের তত্ত্ব পৃথিবীতে যতোটা তাত্ত্বিক প্রাবল্যে বর্তমান ততোটা বাস্তবে নয়, প্রকারান্তরে সেটা ‘সকল মানুষ এক অখ- মানবজাতির অংশ’ এই সত্য থেকে মানুষকে সরে থাকতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। বর্তমান রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের বিষয়ে বাংলাদেশে শ্রেণিস্তর নির্বিশেষে না হলেও বিশেষ করে এক শ্রেণির অত্যোৎসাহী মুসলমান এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যম-িত কীছু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন, তা প্রমাণ করে যে, ‘প্যান-ইসলামিজম’-য়ের শেকড় বিশ্বের আর কোথাও প্রোথিত না থাকলেও বাংলাদেশের গভীরে আলবৎ প্রবিষ্ট হয়েই আছে, তিন পতাকার তলে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা তার মূর্তিমান সাক্ষী এবং অদূর ভবিষ্যতে এই আদর্শের অভিঘাতে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থিরতা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে প্যান-ইসলামিজমের তত্ত্বগত আদর্শিক শক্তি সত্যিকার অর্থে কোনও কার্যকর ভূমিকা রাখার রাজনীতিক পদ্ধতি নয়, এ ক্ষেত্রে অবলম্বিত পদ্ধতিটিকে পুরোপুরি মানবিক হতে হবে, যা বিশ্বসা¤্রাজ্যবাদের সঙ্গে চরিত্রগতভাবেই অবশ্যই সাংঘর্ষিক, সে জন্য অবশ্যই জটিল ও কঠিন।
শরণার্থী রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার প্রকৃত স্বরূপকে যদি আমরা গুলিয়ে ফেলতে না চাই তবে আমাদেরকে কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু না মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?/কা-ারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’ যেখানে ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয়ের উর্ধে একটাই পরিচয়, সে কেবল মানুষ, হোক সে মুসলিম, হিন্দু, পার্সিক, বৌদ্ধ, ক্রিস্টান, ইহুদী, জরথুস্ত্র ইত্যাদি যে কোনও ধর্মের কিংবা রোহিঙ্গা, বর্মী, চীনা, শিখ, গারো, আরব, ইরানি, নিগ্রো, ইংরেজ, তামিল, সাঁওতাল, মগ, চাকমা ইত্যাদি যে কোনও জাতির কিংবা কোনও গোত্র, বর্ণ, সম্প্রদায়ের। তাতে কীচ্ছু যায় আসে না। কবি নজরুলের নির্দেশিত মানবিকতার আদর্শকে পাথেয় করেই বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সমস্যার নিরসনে অগ্রসর হতে হবে, বিশ্বমানবকে সঙ্গী করে। প্যান-ইসলামের তপজপে নিমগ্ন থেকে নিজেকে বিশ্বমানবতা থেকে সরিয়ে এনে একঘরে করে দিয়ে সমস্যার প্রকৃত বাস্তবতা, যাকে বলে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর কার্যকর রাজনীতিক বন্দোবস্থ করা, থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না, বরং সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ার সম্ভবনা উত্তরোত্তর বাড়তে পারে এবং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিক আর্থনীতিক পরিস্থিতে সেটাই স্বভাবিক। মনে রাখতে হবে, প্যান-ইসলামের বিশ্বভ্রাতৃত্বের খেলা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, ইসলামি বিশ্বভ্রাতৃত্বের সুবাদে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের গভীরে অনুপ্রবেশসহ নাগরিকত্ব নিতে শুরু করেছে। যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও কীছু ঘটে যেতে পারে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে বাংলাদেশে মন্দির ভাঙার মহোৎসব শুরু হওয়ার মতো এবার বুদ্ধমন্দির ভাঙা শুরু হলে অবাক হওয়ার কীছু থাকবে না। বলা বাহুল্য, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি হয়ে যাওয়াটা রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান নয় বরং বাংলাদেশের জন্য খাল কেটে কুমির আনার ভয়ঙ্করত্বকে আমন্ত্রণ করা। সুতরাং সাধু সাবধান।