একটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নির্মূলকরণে মিয়ানমারের সহিংসতা প্রতিদিন মাত্রা ছাড়াচ্ছে। বিপন্ন রোহিঙ্গারা দলে দলে আশ্রয় নিচ্ছেন বাংলাদেশে। মিয়ানমারের চাইতে আয়তনে ছয় গুণ ছোট আবার জনসংখ্যায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি বাংলাদেশে এই শরণার্থীদের চাপ নানাবিধ সংকট তৈরি করছে। গত কয়েক দশক ধরে এই শরণার্থী সমস্যাটি বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বহু রোহিঙ্গা এ দেশের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গেছে। মূলত কক্সবাজার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনমিতি ও ভৌগোলিক পরিবেশকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। কিন্তু কার্যকর অর্থে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত বিশ্বসম্প্রদায়ের আবেগ ও অনুভূতি কেবল মানবিক সহায়তা দানের মাঝে আটকে আছে। এর রাজনৈতিক সমাধানের দিকটি থেকে যাচ্ছে ভীষণভাবে উপেক্ষিত। বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী এটিকে ধর্মীয় চরিত্র দানের মাধ্যমে এই সমস্যার মূলে যে রাজনীতি তাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা নামক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীটি ঐতিহাসিকভাবে বার্মার নাগরিক। এই সম্প্রদায়ের লোকেরা একসময় বার্মা তথা মিয়ানমারের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু এখন এদের কপালে বাঙালি তকমা লাগিয়ে মিয়ানমার তাদেরকে মূলত মাতৃভূমি ছাড়া করতে চাইছে। তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম অত্যাচার নিপীড়ণের স্টিমরোলার চালাচ্ছে। জোর করে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য করার মধ্যে মিয়ানমার সরকারের যে বর্মী জাতিয়তাভিত্তিক উগ্র নীতি কাজ করছে সেটি বিশ্বমানবতা লংঘনের পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকা-ও বটে। এমন মানবতা বিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বকে আজ সোচ্চার হতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার নিজেদের শত সমস্যার মাঝে এই মানবতার ডাককে অস্বীকার করতে পারে নি। আশ্রয় দিয়েছে দেশ ছাড়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে। বাংলাদেশ তার কাজ করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র এই মানবিক সহায়তা দানের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হওয়ার নয়। এই শরণার্থীদের আবারও দেশে ফেরৎ পাঠানো এবং প্রত্যাগত রোহিঙ্গারা যাতে স্বভূমিতে শান্তিপূর্ণভাবে সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারেন সেই ব্যবস্থা করাই মূলত আসল কাজ। আর এখানেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের মূল ফোকাস দেওয়া দরকার। একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো রোহিঙ্গাদের ভিতর থেকে সেরকম কোন ক্যারিসমেটিক নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে দেখা যায়নি। নেতৃত্বের এই সংকটও তাদের সমস্যাকে ঘনিভূত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ভুলপথে সন্ত্রাসবাদী কাজে অংশ নিয়ে মূলত নিজেদের নিরীহ নাগরিক সম্প্রদায়কে বরং আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের ভিতর থেকে তাই সুনেতৃত্ব বেরিয়ে আসাটা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
আসুন রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিবেচনা না করে একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার মিয়ানমারীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে আমরা যে যার অবস্থান থেকে কাজ করি। বিশ্বসম্প্রদায় বিশেষ করে ক্ষমতাশালী দেশগুলোর সমর্থন ও সহনাভূতি আদায়ে এই পন্থাটিই সর্বোত্তম হবে বলে আমাদের কাছে মনে হয়।