- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

লক্ষ্যমাত্রার ২৫ ভাগ ধান-চালও কিনতে পারে নি খাদ্য বিভাগ

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ খাদ্য বিভাগ ধান-চাল ক্রয়ের সময় সীমার ৪ মাসের মধ্যে ২ মাস পাড় হয়ে গেলেও এখনো লক্ষ্যমাত্রার ২৫ ভাগও কিনতে পারে নি। খাদ্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, আমরা আশাবাদি, ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। জেলার কৃষক নেতারা বলেছেন, খাদ্য বিভাগ যে নিয়মে বা নীতিমালার ভিত্তিতে ধান কিনছে, তারা ধান চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না। বুধবার জেলা খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জেলার প্রায় একশ মিল মালিককে কেন চুক্তি মোতাবেক চাল দিচ্ছেন না, কারণ দর্শাণোর চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জে এবার প্রায় ১৩ লাখ টন বোরো ধান হয়েছে। সরকার ধান কিনবে ৩২ হাজার ২৬৪ টন। চাল আতব ১৪ হাজার ৩০৯ এবং সিদ্ধ ১৪ হাজার ৬৮৭ টন কিনবে।
জেলায় এমন বাম্পার উৎপাদনের পরও খাদ্য বিভাগ ২৯ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ হাজার ১৯১ টন ধান এবং চাল সিদ্ধ ২৪৩৫ এবং আতব ৩০১৩ টন কিনেছে।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ধান চাল কেনার এই করুণ অবস্থায় কৃষক নেতারা বলেছেন, সরকার যেভাবে, বা যে নীতিমালা মোতাবেক ধান কিনছে, ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না।
জেলার শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বলেন, আমি একজন বড় কৃষক। মঙ্গলবার আমি ৮২৮ টাকা মণ দরে মিটারে মেপে ৪০০ মণ হীরা ধান বিক্রি করেছি। বাড়ী থেকেই ধান নিয়েছে ব্যাপারী। অন্য কৃষকরাও এভাবে বিক্রি করছেন। খাদ্য গোদামে ধান নিয়ে গেলে ময়েশ্চার, কম শুকনা ইত্যাদি নানা কথা বলে কোন কোন ক্ষেত্রে হয়রানিও করা হয়। গোদামে ধান নিয়ে যেতে পরিবহন খরচও বেশি লাগে। এজন্য ধান কৃষকরা গোদামে নিয়ে যেতে আগ্রহী নয়। আমি মনে করি ধান কেনার লক্ষমাত্রা পুরণ করতে হলে বড় বড় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে শুকনো ধান কিনে নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত ১০৪০ টাকা থেকে কিছু টাকা কমেও কেনা যাবে, অর্থাৎ পরিবহন খরচের টাকা কৃষকদেরই কম দেওয়া যেতে পারে।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা, ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, লটারী বাদ দিয়ে উন্মুক্ত করলেও কৃষক সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে এবার ধান দিতে যাবে না। আমি মঙ্গলবার বাড়ী থেকেই ২৯ জাতের ৪২ মণ ধান বিক্রি করেছি ৯৭০ টাকা মণ দরে। তাহলে পরিবহন খরচ দিয়ে, তৈল মর্দন করে, সরকারি দলের নেতাদের দিয়ে তদবির করিয়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান দিতে যাব কেন? আমরা মনে করি সরকার ধান চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না। সরকার আগে থেকেই আমাদের কথা শুনে নি। আমরা বলেছিলাম মোট জাতীয় উৎপাদন কম হচ্ছে। অনেক জমি পতিত থাকছে, কৃষির প্রতি অনিহা তৈরি হচ্ছে কৃষকের। সরকার তখন শুনেন নি। মোট জাতীয় উৎপাদন কম হওয়ায় কৃষকের ধান এখন ফড়িয়াদের হাত হয়ে মিলে চলে যাচ্ছে। সরকার হয়তো কিছু চাল মিল মালিকদের কাছ থেকে নিতে পারবে। ধান কিনতেই পারবে না। ধান এখন কিনতে হলে গ্রামে গ্রামে-হাটবাজারে অস্থায়ী ক্রয় কেন্দ্র করে সহজ শর্তে ধান কিনতে হবে।
দিরাইয়ের আওয়ামী লীগ নেতা, রাজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, বড় কৃষক আব্দুছ ছাত্তার বলেন, দলীয় ক্যাডার ও খাদ্য কর্মকর্তার সঙ্গে নানাভাবে লাইন করে ধান দেওয়া লাগে। একারণে ৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় অনেকে কার্ড বিক্রি করে দিয়েছেন।
সিপিবি’র সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, পত্রিকায় দেখেছি সরকার বিদেশ থেকে ধান-চাল আমদানী করবে। এটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হবে। কৃষককের বাড়ী থেকেই সহজ শর্তে ধান কেনা যাবে। কৃষকদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করলেই হবে, ধান গোদামে পৌঁছে দেবার খরচ কৃষকের। তাহলে লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ধান কেনা এখন ২ সপ্তাহের বিষয়।
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরে বুধবার ২৯ জাতের ধান বিক্রি হয়েছে ৯৩৫ থেকে ৯৪০ টাকা এবং ২৮ জাতের ধান বিক্রি হয়েছে ৯৫৫ থেকে ৯৬০ টাকা মণ দরে। প্রতিদিন এই ধানের আড়তে এখন ১০ থেকে ১২ হাজার মণ ধান বেচা কেনা হচ্ছে বলে জানালেন আড়তের সাবেক সভাপতি জ্যোতির্ময় রায়।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মুস্তফা জানালেন, আমরা আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ধান কিনতে পারবো। মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬ হাজার ১৯১ টন ধান কেনা হয়েছে। চাল আতব ৩০১৩ এবং সিদ্ধ ২৪৩৫ টন কেনা হয়েছে। কৃষদের নানাভাবে জানানো হচ্ছে তারা হয়রানিমুক্ত ভাবে ধান দিতে পারবেন। তারা যেন সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে আসেন। বড় কৃষক ৬ টন, ছোট কৃষকও ২-৩ টন ধান দিতে পারবেন।
চালের ক্ষেত্রে ৩০০ মিলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। যারা কিছু দিয়েছেন তাদেরকে বুধবার তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। যারা একেবারেই দেন নি এরকম একশ’এর বেশি মিল মালিককে চুক্তি লঙ্ঘন কেন করছেন মর্মে বুধবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। চুক্তি লঙ্ঘন করলে কালো তালিকাভুক্ত হবেন, সেটিও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে।

  • [১]