- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

লোকজ উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে

উন্নত ও আধুনিক যন্ত্রকৌশল আবির্ভাবের বহু আগে মানুষ নিজস্ব লোকায়ত পদ্ধতিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করে। মানুষ নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদার জোগান দিতে নিজেরাই উদ্ভাবন করে এসব লোকজ উৎপাদন কৌশল। শত শত বছর ধরে আমাদের সমাজ সভ্যতার চাকাকে সচল রেখেছিলেন এসব উৎপাদকগোষ্ঠী। কালের বিবর্তনে উন্নত যন্ত্রকৌশল আবিষ্কারের সাথে তাল মিলিয়ে একে একে বিলুপ্ত হতে থাকে এসব স্থানীয় লোকজ উৎপাদন ব্যবস্থা। এসব পেশার সাথে জড়িত অসংখ্য মানুষ হয়ে পড়েন বেকার। অগ্রগতির মেজাজের সাথে পাল্লা দিতে মানুষকে সবসময়ই আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু ঐতিহ্যকে একেবারে বিলুপ্ত করে দিয়ে যে সভ্যতা গড়ে উঠে তা শিকড়ের সংযোগ ছেড়ে দেয়া এক ধরনের উন্মূল বিষয় হিসাবে পরিচিত হয়। এর না আছে ইতিহাস, না আছে বিবর্তনের পথরেখা, না আছে ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ। ঐতিহ্যকে যতেœর সাথে লালন করতে হয়, এটিই পৃথিবীর সর্বজনগ্রাহ্য উন্নয়নমন্ত্র। যখন এর ব্যত্যয় ঘটে তখন বুঝতে হবে ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান, সমাজ থেকে রাষ্ট্র; সকলেই পিছনের বিশাল সময়ের ছাপকে অস্বীকার করছে।
কথাগুলোর উন্মেষ ঘটল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গতকাল প্রকাশিত দিরাই’র হারানপুরের ঘানিশিল্পী মহামায়ার পেশা হারানোর কষ্টকথা জেনে। মহামায়া ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে হারানপুরে এসেছিলেন। সে থেকে তিনি কাঠের ঘানিতে শর্ষে পিষে তৈরি করা শুরু করেন খাঁটি সরিষার তেল। এই পেশা তাঁকে জীবন ধারনের নিশ্চয়তা দিয়েছিলো। পরিবার পরিজন নিয়ে মহামায়া বেশ চলছিলেন। কিন্তু এখন আর স্বপেশাতে থাকতে পারছেন না মহামায়া। কাঠের ঘানি ভেঙে পড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত খাঁটি সরিষার তেলের যে দাম পড়ে সেই দামে আর তেল অনেকে কিনতে চান না। মহামায়া বলেছেন, উৎপাদিত এক লিটার খাঁটি সরিষার তেল তিনি ৭ শ’ টাকার কমে বেচতে পারেন না। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতির উৎপাদিত তেল এর চাইতে কম দামে বাজারে পাওয়া যায়। মহামায়া অনুভব করছেন তার যুগ শেষ কিন্তু তিনি নিজের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রাখতে ভীষণ উন্মুখ। বলেছেন সহায়তা পেলে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন।
মহামায়ার এই আখ্যান তার একার গল্প নয়। এ হলো সনাতনী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত অসংখ্য মহামায়াদের করুণ আখ্যান। আঁখ মাড়িয়ে গুড় তৈরি করা, মাটি ডলে মৃৎপাত্র তৈরি করা, বাঁশ ও বেতকে শৈল্পিক রূপময়তায় ফুটিয়ে ঘর-গেরস্থালীর সামগ্রী তৈরি করা; এমন শত শত খাত এখন আধুনিক যন্ত্র আগ্রাসনের শিকার হয়ে কিছু একেবারেই মরে গেছে আর কিছু মৃতপ্রায়। অথচ এগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শামিল হওয়া যায়। মহামায়া নিজের তৈরি করা সরিষার তেল নিয়ে খাঁটিত্বের যে গর্ব করতে পারবেন সেই গর্ব কি বাজারে সস্তা দরে পাওয়া অন্য তেল নিয়ে করার সুযোগ আছে? সমাজে কিছু ব্যক্তি তো এখনও আছেন যারা বেশি দামে হলেও ভালো জিনিস খুঁজেন। তাঁদের কারণেই বেঁচে থাকতে পারেন মহামায়ারা। মহামায়ার পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তাঁরা আর্থিক প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে মহামায়াদের টিকিয়ে রাখলে মূলত বেঁচে থাকে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এখন তো অর্গানিক ফুড বা প্রোডাক্ট বলে একটা কথা বেশ চালু হয়েছে। বড় শহরে বেশ উচ্চমূল্যে অর্গানিক প্রোডাক্ট বিক্রি হয়। মহামায়াদের ওই চেইনের সাথে সংযোগ করে দিতে হবে। বিপণনের আধুনিক কলাকৌশলগুলো তারা তেমন জানেন না। একটু সহযোগিতা পেলেই তারা একই সাথে নিজেকে ও যুগ যুগের ঐতিহ্যকে লালন করতে পারবেন।

  • [১]