বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
আজ পহেলা বৈশাখ। বাঙালির সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও চিরায়ত লোক সংস্কৃতির গভীর অনুরাগের ছোঁয়া লেগে আছে এ দিনটায়। পহেলা বৈশাখ অন্যরকম উৎসবের দিন। এ দিনে জাত-ধর্ম, উঁচু-নীচুর বাধা ডিঙিয়ে পুরো বাঙালি সর্বজনীনতার এক অদ্ভুত জায়গায় মিলিত হয়। পুরাতনকে নতুনের আলোয় মুছে দিতে তারা বৈশাখের প্রথম দিনে গেয়ে ওঠে- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। কিন্তু বাঙালির এই প্রাণের উৎসব অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
কবি-সাহিত্যিকেরা সময়ে সময়ে প্রাণের বৈশাখে মিশতে গিয়ে বলেছেন- ‘মন দিয়ে মন নেইগো সবাই কিনে, বৈশাখের এই দিনে’ কিংবা ‘কে যেন শোনায় মহা মিলনের ডাক / সেতো নববর্ষ সেতো বৈশাখ। / সে আমার চেতনা দীপ্ত অঙ্গীকার / সে আমার নববর্ষ আমার অহংকার।’ কবি নজরুল বৈশাখে গেয়েছেন- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর / ঐ নুতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।’ বৈশাখকে নিয়ে কবির কবিতা-গান সবই আছে, শুধু নেই পহেলা বৈশাখের অতীত ঐতিহ্য অনুরাগ।
বাঙালির শাশ্বত সংস্কৃতির এপিঠ-ওপিঠে সজাগ দৃষ্টি ফেলে দেখা যায়, গ্রাম-গঞ্জে এখন আর আগের মতো নেই চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের নানাবিধ আয়োজন। বর্তমান যান্ত্রিক জীবনধারায় খেই হারিয়েছে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের চিরন্তন কৃষ্টিগুলো। বৈশাখী মেলায় প্রাণ ফিরে পাওয়া সেই স্থানগুলো এখন মৃতপ্রায়। গ্রাম-গঞ্জে ঘটাহীনভাবে চৈত্র সংক্রান্তি পালন হলেও হাট-বাজারে উদযাপিত হালখাতা উৎসব যেন খেরোখাতার লাল ফিতায় বাঁধা পড়েছে।
বৈশাখের প্রথম দিনে বসে না যাত্রাপালা আর লোকসঙ্গীতের জমজমাট আসর। মেলার জন্য বানানো মাটির তৈজসপত্রে সেই কবে আল্পনা এঁকেছিলেন তা ভুলে গেছেন মৃৎশিল্পীরা। হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে মুড়িমুড়কির মধুময় ঘ্রাণ। নাগরদোলায় উঠানামার হাঁকডাকও থেমে গেছে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, ঘুড়ি উড়ানোর মতো লোকজ সংস্কৃতির গ্রামীণ অনুষঙ্গগুলো বিলীন হয়ে গেছে। সেই বিলীন হওয়া স্মৃতি আওড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষেরা।
জামালগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সমরেন্দ্র আচার্য শম্ভুর সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলা নববর্ষকে ঘিরে সম্প্রীতির এক মেলবন্ধ লক্ষ করা যেত। বাংলা বর্ষের প্রথম দিনে সাচনা বাজারের সিএন্ডবি রোডের খোলা জায়গায় বিশাল মেলা বসত। সেই মেলা অষ্টমীর মেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। মেলাস্থলে চারটি কুঠায় কাপড় পেঁচিয়ে অস্থায়ী মন্দির তৈরি করা হত। সাচনা বাজার জগন্নাথ জিউর মন্দির থেকে জগন্নাথ দেবকে মাথায় করে এনে সেই মন্দিরে বসিয়ে পূজার্চনা চলত। পরবর্তীতে সেই মেলা স্থানান্তর হয়ে সাচনা গ্রামের পেছনের কালী বাড়ির খোলা মাঠে চলে যায়। কালের বিবর্তনে সে মেলাও এখন লুপ্ত। তখনকার পহেলা বৈশাখের সাথে বর্তমান বাস্তবতার কোন মিল নেই।
মূলত চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের মাধ্যমেই বাংলা নববর্ষকে আহ্বান করা হত। এ সময় চৈত্র মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যেই বোরো ফসল ঘরে উঠত। বোরো ফলাতে জৈব সার ব্যবহার করত কৃষক। সার ও যান্ত্রিক ব্যবহার একদম ছিল না। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাগালু (ধান কাটার বেপারী) আসত দলে দলে। বাগালুরা মরিচা গুড়, খেজুরে গুড়, হাড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের তৈরি তৈজসপত্র নিয়ে আসত। এগুলো বৈশাখী মেলায় বিক্রি করে বাড়ি ফিরত তারা।
অষ্টমীর মেলায় বদরপুর, সাচনা পাল হাটি, বেহেলী গ্রামের মৃৎশিল্পীরা মাটির তৈরি পণ্য নিয়ে পসড়া সাজিয়ে বসত। মিষ্টি, মুড়ি-মুড়কির দোকানও বসত মেলায়। ওই দিন হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করত সাচনা বাজারের ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বিরল নজির স্থাপন করত পহেলা বৈশাখ। মিষ্টি খাওয়ার ধুম পড়ত বাজারে। সেই সাথে চলত মেলা। বানর খেলা, সাপের খেলা, বায়োস্কোপ, নাগরদোলায় মুখরিত থাকত মেলা প্রাঙ্গণ। অনেক মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে উঠত নদী বন্দরখ্যাত সাচনা বাজার। শুধু সাচনা বাজারই নয় আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হত লোকজ উৎসবের। বাউল গান, লাঠিখেলাসহ লোকজ সংস্কৃতির সকল অনুষঙ্গ বয়ে বেড়াত পহেলা বৈশাখ। যা এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না।
অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে সমরেন্দ্র শম্ভু বলেন, বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি একোরিয়ামে চলে গেছে। পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ উৎসবটা এখন শহরের পান্তা-ইলিশ ও মঙ্গল শোভাযাত্রায় সীমাবদ্ধ। দুই আনা পয়সায় দেখা বায়োস্কোপ এখন ডিজিটাল মারপ্যাঁচে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সুস্থ্য সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতি ভাবটা দিন দিন নষ্ট হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংস্থা সিএনআরএস-এর সুনামগঞ্জ জেলার মুখপাত্র ও উপজেলা উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াহিয়া সাজ্জাদ বলেন, পহেলা বৈশাখ সার্বজনীনতার বিশাল একটি ক্ষেত্র এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির অন্যতম উৎস। বাঙালি জাতিসত্বার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যেখানে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। পরাজিত শক্তি এই অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন উৎসবকে হিন্দুয়ানি বলে পেছনে টানার চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে অতীতে উদযাপিত পহেলা বৈশাখের উৎসবাদি বর্তমান অস্থির বাস্তবতায় হারিয়ে যাচ্ছে। সেটা বাঙালি জাতিসত্তার জন্য অশুভ লক্ষণ।