- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শত চেষ্টা করেও রক্ষা করা গেল না সমসা হাওর

এমএ রাজ্জাক, তাহিরপুর
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর এবার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের সমসার হাওরের বৈঠাখালি বাঁধটি সেচ্চাশ্রমে হাজারো কৃষক রাতদিন শত চেষ্টা করেও রক্ষা করতে পারেননি। কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী পানির স্রোতে রবিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটে বৈঠাখালী বাঁধ ভেঙ্গে ২ হাজার একর বোর ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, এক ফসলী সমসার হাওরে এ বছর ১৩’শ একর বোরো ধানের চাষ করা হয়েছিল। তবে, কৃষকদের মতে ২ হাজার একরের বেশী বোর ধান চাষ করা হয়েছিল এ বছর।
সোমবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, টাঙ্গুয়া হাওরে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাটলাই নদী দিয়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী পানির স্রোত মদনপুর ও তেরগ্রামের মধ্যবর্তী বৈঠাখালী বাঁধটি ভেঙ্গে প্রবল স্রোতে হাওরে পানি প্রবেশ করে হাওরের পানির সঙ্গে নদীর পানি একাকার হয়ে গেছে। অসময়ে পানিতে বোর      
ধান তলিয়ে যাওয়ায় হাওর পাড়ের মদনপুর, জামালপুর ভোরাঘাট  দুধের আউটা, সমসারপাড়, চারাগাঁও, কলাগাঁও, মন্দিয়াতা, তেরঘর সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা কান্নায় বুক ভাসাচ্ছেন। হাওর তলিয়ে বোরো ধান নষ্ট হওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে কুষকরা এখন চরম বিপাকে পড়েছেন।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য সুধাংশু দাস জানান, হাওর পাড়ের শত শত কৃষকদের নিয়ে নিজ অর্থায়নে গত ২ সপ্তাহ ধরে নিজের যা সম্বল ছিল তা দিয়ে হাওরের বাঁধ রক্ষা করতে চেষ্টা করেছি। তবুও নদীতে পানি বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত হাওরটি রক্ষা করতে পারিনি।
তিনি বলেন সমসা, চুনখলা হাওরের এক ফসলী বোরো ধানের উপর হাজার হজার কৃষকের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সোমবার রাত সাড়ে ৯টা ৫০ মিনিটে বৃষ্টি ও উজানের পানি এসে সেই অবলম্বনটুকু কেড়ে নিল।
মদনপুর গ্রামের কৃষক প্রবোদ তালুকদার বলেন, ভাই এই হাওরের ফসল দিয়া আমাদের সারা বছরের (এক বছর) খোরাকি (খাওয়ান) চলার পর বাড়তি ধান বেইচ্ছা (বিক্রি) বাড়ির ছেলে মেয়ের বিয়া সাদি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বাড়ির ঘর ঠিক করি, কাপড় চোপড় কিনি। কিন্তু হাওর ডুবে যাওয়ায় এখন ঘরে ঘরে আহাজারি ও আর কান্নার রোল পড়ছে।
একই গ্রামের কৃষাণী রিনা রানী দাস বলেন, বছরের ছয়মাস আমাদের এলাকা এমনিতেই পানিতে ডুবে থাকে। এক ফসলী এ ধানের খড় থেকেই গরুর সারা বছরের খাবার হতো। এখন হাওর ডুবে গেছে আমরাই কিভাবে বাঁচব আর গরুকেই কিভাবে বাঁচাব।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী শাহ আলম বলেন, এ বাঁধটি পানি উন্নয়নবোর্ডের আওতাভুক্ত না হওয়ায় সরকারী কোন বরাদ্দ দেয়া হয়নি এ হাওরে।
আমরা হাওরবাসী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী রুহুল আমিন বলেন, বাঁধে দুর্বল কাজ হওয়ায় একে একে সব হাওর ডুবে যাচ্ছে। হাওরাঞ্চলের মানুষদের নিয়ে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চলমান। অধিকারের প্রশ্নে হাওর পাড়ের মানুষদের একত্রিত হওয়া প্রয়োজন।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খসরুল আলম বলেন, সমসা ও চুনখলা হাওর কয়েক বছর পানিতে না নেয়ায় এবছর কৃষকরা বেশী ফলন পাওয়ার আসায় হাওরের নির্ধারিত বেষ্টনি ছাড়াও হাওরের আশে পাশের কান্দায়সহ প্রায় ২ হাজার একরের মতো বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু সব কিছুই তো সোমবার রাতে শেষ হয়ে গেল।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান,এ হাওরে যাতে আগামী বছর সরকারী বরাদ্দ দেয়া হয় সে ব্যাপারে উপরে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কৃষকদের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা করা হবে।
জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আবুল হোসেন খান বলেন, এই হাওরে সরকারী বরাদ্দ না থাকলেও আমরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও নিজ নিজ অবস্থান থেকে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে হাওরটি রক্ষা করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করেছি। কিন্তু নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে শেষ পর্যন্ত হাওরটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে এই হাওরটিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত করার জন্য চেষ্টা করা হবে।

  • [১]