কামাল হোসেন
ইজমগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পড়লে মনে হয় সাহিত্যের ভাগ আছে, সাহিত্য ভাগ হয়ে গেছে এক শতক থেকে আরেক শতকে। ব্যাখ্যায় এমনটি উঠে এলেও আমার কাছে তা ঠিক মনে হয়নি কখনও। সবক’টি ইজমের তাপমাত্রা মানুষের মগজে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উত্তেজনায় প্রবাহিত হতে পারে। সমালোচকরা রোমান্টিসিজম কে প্রবল বিতর্কমূলক বলে অভিহিত করেছেন। এফএল লুকাস তার ‘দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল্ দ্য রোমান্টিক আইডিয়াল’ গ্রন্থে রোমান্টিসিজমের ১১ হাজার ৩৯৬টি সংজ্ঞার কথা বলেছেন। এ হিসেবের মধ্যে যে ধরনের কৌতুকাশ্রিত বিদ্রুƒপ রয়েছে, সেখান থেকেই আন্দাজ করা যায়- এগুলো দিয়ে সাহিত্যকে আলাদা করার খুব বেশি যৌক্তিকতা থাকে না। রোমান্টিকতার আসল চিত্রে দেখানো হয় -এ সাহিত্যতত্ত্ব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ব্যক্তি-মানসনির্ভর। আবার জার্মান শিল্পতত্ত্ববিদ ফ্রিডরিচ ভন শ্লেগেলের মতে, ‘ক্ল্যাসিসিজম হল অসীমের ভাবাদর্শ এবং ভাবাবেগকে সীমানানির্দিষ্ট অবয়বের মধ্যে ব্যক্ত করবার প্রয়াস।’ এবং তিনি এ-ও বলেছেন যে, ‘ক্ল্যাসিক সাহিত্যতত্ত্ব রোমান্টিকতার ধারণার সঙ্গে সহাবস্থান করে।’ আধুনিকতা নিয়েও অনেক ধরনের আলোচনা প্রতিষ্ঠিত আছে, এমনিতেই আধুনিক কথাটি আপেক্ষিক, বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দিক থেকে এর ব্যাখ্যাও হতে পারে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় রচিত সাহিত্যকে যে আধুনিক সাহিত্য হিসেবে ধরে নেয়া হয়- সেটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ জীবন বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে প্রবাহিত হয়েছে। অনেক দেশেরই হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, সেখান থেকে আমূল পরিবর্তন হয়নি, প্রভাবিত হয়েছে; তা-ও একেক জায়গায় একেক রকমভাবে। এ কথাগুলো মনে এসেছে মোহাম্মদ সাদিকের ‘শফাত শাহের লাঠি’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ে। বইয়ে প্রায় ১৫০টি কবিতা রয়েছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থে বিচ্ছিন্ন এ কবিতাগুলো কোনো ইজমেই ফেলা যায় না, আবার সবই আছে এর মধ্যে। বৃহৎ অর্থে কবিতাগুলো একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য্যরে আকর। কিছু কবিতা আছে যেগুলো নিওক্লাসিসিজমের ঢংয়ে লিখিত, কিন্তু ঔজ্বল্য ছড়াচ্ছে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারে থেকে।
যেমন :
যখন বানের ভেলা ভাটিয়ালি দেশে যায়/তুমি উজানের স্রোত ঠেলে ফিরে চলো বেহুলার মতো/গাঙের কিনার থেকে গাঙচিল চেয়ে থাকে/মরমি নদীর দিকে, আর/মনমাঝি তার বৈঠা ভুলে উদাস হাওয়ায়/একতারা হাতে কাঁদে লালনের গান!
(ভিনদেশি)
এখানে আধুনিক জীবনের বাস্তব সত্যের স্পষ্ট উচ্চারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছে। দুর্যোগে জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার অশ্রু লেগে আছে কবিতার নির্মাণে। ক্ল্যাসিসিজমের ঐতিহ্য প্রবণতাও কবির হাজার বছরের নদীতে সাঁতরাচ্ছে, কবির আকাশে গাঙচিল উড়ছে, আবার একইসঙ্গে রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে তার ভেতরের মাঝি উদাস হাওয়ায় বেরিয়ে পড়ছে লালনের গানে গানে।
একজন কবি যখন প্রাকৃতিক হয়ে ওঠেন, তার জীবনদর্শন এবং যাপনের মধ্য দিয়ে; তখন তার মধ্যে আশ্রয় করে নেয় একটি সামগ্রিক জীবন। পরিস্থিতির আঘাতে সে জীবন অনেক দুর্যোগের রং প্রসব করতে পারে, ফিরে যেতে পারে তার ইতিহাস ঐতিহ্যের কাছে। মোহাম্মদ সাদিক সামগ্রিক জীবনকে ধারণ করতে পারার মতো কবি। তাকে আধুনিক উত্তরাধুনিক অথবা রোমান্টিক নামের কোনো বিশেষ গোত্রে ফেলা রাখা কঠিন। আমাদের এখানে যেমন দশক বিভাজনের রেওয়াজ আছে- সেই ছোট্ট পরিসরেও মোহাম্মদ সাদিকের মতো বড় কবিকে বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। তার একটি নিজস্ব ভূমি আছে, তার ক্যানভাসটা সময়ের অন্যদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি কবিতায় নানা টেকনিকে নিজের সংস্কৃতির পিলার তৈরির চেষ্টা করেছেন, এবং সফলও হয়েছেন। তার ‘ছোট’পা তোর নকশি কাঁথা’ শিরোনামের কবিতাটি আমার কাছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায়- আল মাহমুদের ‘নোলক’ কবিতার মতো বাংলাসাহিত্যের আরেকটি মহৎ কবিতার সংযোজন ‘ছোট’পা তোর নকশি কাঁথা’ কবিতাটি। নোলকে দেশের প্রকৃতি এবং মানুষের আবেগ উঠে এসেছে ঐতিহ্যকে আশ্রয় করে। আর মোহাম্মদ সাদিকের ‘ছোট’পা তোর নকশি কাঁথা’ কবিতায় এখানকার মানুষের শত শত বছরের যাপন নদীর ঢেউয়ের তালে তালে বলে চলেছে এ ভূখন্ডের দুঃখ-সুখের ইতিহাসের কথা, গেয়ে চলেছে জীবনের গান।
কবিতাটি নিচে উদ্বৃত করছি :
ছোটো’পা তোর নকশি কাঁথা বুনতে বুনতে নামল এসে/শীতের শিশির/তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না!
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এ কোন কাঁথা বুনলি আপা!/এ কোন নিখুঁত গাছ-গাছালি; স্বচ্ছ বকুল, অশ্রুবিন্দু!/হাতের আঙুল সুচের ডগায় বিদ্ধ হয়ে লালচে আবির-/লাগল কাঁথার কোমল বুকে/ তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না!
লতার মতো জড়িয়ে-থাকা সবুজ রেখা/লুকিয়ে-থাকা ফুলের কুঁড়ি, রুপার কাঁকন, ঢাকাই শাড়ি/ধীর গতিতে হাতের কাঁটা যাচ্ছে বুনে সময় থেকে সময় নিয়ে/সব সকালের সব বিকেলের চিহ্ন আঁকা/ছোটো ’পা তোর নকশি কাঁথা আসবে কবে আমার ঘরে?/ঢাকবে কবে আমার শরীর?/ওই তো শীতের হিমেল হাওয়া আসছে ছুটে/ঝরিয়ে দিতে স্বপ্ন-সুখের শোভন পাতা/ছোটো’পা তুই বুনলি কেবল তরতাজা সব ফুলের ছবি, ধানের ছড়া/বিহান বেলার দোয়েল শালিক, প্রজাপতি/প্রসন্ন সব শাপলা শালুক/পালকি এবং পাখির পালক।/শীতের তোড়ে কাঁপছি আমি, কাঁপছে আজো/করুণ স্বদেশ/লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি কাঁথা বুনলি আপা/তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না!
মোহাম্মদ সাদিকের এই ছোট’পা বাঙালি মানসিকতার সবারই আপা। শেষ বিকালের হাসির মতো এ আপা শুধু ভাইয়ের সকালের স্বপ্নের আলো জ্বেলে অপেক্ষায় থাকে। ভাইকে ঘিরেই এ আপাদের মাতৃস্নেহের কর্ষণ শুরু। চিরায়ত বাঙালি নারীর সন্তান লালনের এবং সাংসারিক দায়দায়িত্বের চর্চাটি খুব আনন্দের সঙ্গেই এ বোনেরা করে থাকেন ভাইকে ঘিরে। মোহাম্মদ সাদিক এ কবিতায় আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির চিত্রটি অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বলভাবে এঁকেছেন। এমন কবিতা পাঠে যে কারও দেশপ্রেম বহুগুণে জেগে উঠবে। মানুষ স্নেহ-মমতাময় হয়ে উঠবে। নিজের সংস্কৃতিতে যে কত সম্পদ রয়েছে এখানে তা-ও উঠে এসেছে। কবিতাটি পড়লে যে কারও নিজেকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে, নিজের পরিবারকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে। এমন কবিতা যত পড়বে দেশপ্রেমের মহিমায় সে জাতি ততো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
এই কবিতার প্রত্যেকটি উপমা-চিত্রকল্প অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ, ভালোবাসার শীতল পরশে আবৃত, আবেগের রসে সিক্ত। এ কবিতার বিষয় এবং উপস্থাপনের সফলতা ছাড়াও কিছু কিছু উপমায় কবি তার কবিসত্তার শক্তি দেখিয়েছেন। যার বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। যদিও এখানে তা করার সুযোগ নেই।
যেমন :
’ধীর গতিতে হাতের কাঁটা যাচ্ছে বুনে সময় থেকে সময় নিয়ে/সব সকালের সব বিকেলের চিহ্ন আঁকা’
কী অসাধারণ! সময় থেকে সময় নেয়ার এই উপমাটিতে ঢেউয়ের ছবি ভেসে উঠেছে, সে ঢেউ যেন দীর্ঘ একটি সুতো যে সময়কে গেঁথে চলেছে। আর সকালের বিকেলের বিমূর্ত চিহ্নটি কেমন মূর্ত ছবি হয়ে জ্বলছে। বইয়ের নামকরণ একজন বাউল শিল্পীর নামে। বিশ্বদরবারে বাঙালিত্বের গুরুত্ব যেমন বাড়িয়েছে বাউলতত্ত্ব এবং বাউল শিল্প, ঠিক তেমনই অসাধারণ উপমা চিত্রকল্পের সম্পদে ভরে থাকা ‘শফাত শাহের লাঠি’ও বাংলা কবিতায় মাথা উঁচু করে থাকবে বহু বছর। (সংকলিত)