- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা

আজ শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস ব্যাপী শহিদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর এই দিবস পালন করা হয়ে থাকে। মূলত পুরো যুদ্ধকালেই বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাক বাহিনী। ২৫ মার্চের কালোরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাযজ্ঞ থেকে শুরু করে বিজয় অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত তাদের এই বুদ্ধিজীবী নিধনপর্ব চালু থাকে। যুদ্ধের শেষ লগ্নে যখন পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তখন ব্যাপকভাবে লক্ষবস্তু করে করে আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় বড় সংখ্যক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। তারা শুরু থেকে বেছে নিয়েছিল সেইসব প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বদের যাঁরা চিন্তা—চেতনায় ছিলেন প্রগতিশীল, যাঁরা স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন, যাঁরা নিজেদের নানা তৎপরতার মধ্য দিয়ে বাঙালি ও বাঙালির আত্মনিয়ণাধিকারকে সমর্থন করতেন; তাঁদের। সামরিকভাবে দমন—পীড়নের পাশাপাশি তাঁরা এই ভূখণ্ডকে মেধাহীনও করে ফেলতে চেয়েছিল। পাকবাহিনী যে পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছিল সেই জায়গায় গুটিকয়েক রাজাকার আলবদর ছাড়া দেশের পুরো জনগোষ্ঠীকেই তারা নিজেদের শত্রু গণ্য করেছিল। সেই নীতিরই প্রতিফলন ঘটে বেছে বেছে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান কখনও সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ মনে করেনি। এক ধরনের শঠতা ও প্রবঞ্চনা এবং রাজনৈতিক দাবাখেলার কারণে ১৯৪৭ সনে সবধরণের বিপরীত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশটি তথাকথিত পাকিস্তানের অংশ হলেও কখনও এই দেশের কোন ধরনের স্বার্থ সংরক্ষণে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সামান্যতম সহনাভূতি দেখায়নি। বরং ব্রিটিশ শাসকদের মতোই বাংলাদেশকে তাদের শোষণের মৃগয়াক্ষেত্র মনে করেছিল। তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতি দেখায়নি ন্যূনতম শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষার প্রতি প্রকাশ করেছে চরম অবজ্ঞা, অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই ভূখণ্ডকে রেখেছে একেবারেই অনাদৃত। যে ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের পাকিস্তানভুক্ত করা হয়, বাস্তবে দেখা যায় একই ধর্মীয় পরিচয় হলেও তারা এই অংশের মানুষকে মনে করত অচ্ছুত। ফলে একেবারে শুরু থেকেই বাঙালি জনগোষ্ঠী বুঝে নিয়েছিল পাকিস্তানের সাথে থাকা যাবে না। পৃথক বাঙালি সত্ত্বার অভ্যূদয় এবং একটি জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটানোর তাগিদ দেখা দেয় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এই পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় রেখেছেন অনুপম অবদান। এই দেশের চিন্তকরা যেমন পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়েছেন তেমনি একটি আধুনিক চিন্তাধারা যা পাকিস্তান সৃষ্টির ধর্মীয় জিগির থেকে স্পষ্টতই আলাদা; তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। এই কারণে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে ছিলেন সকল প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী।
স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকবাহিনী গণনিধন যজ্ঞের সাথে জাতির মেধাগত অবস্থানকে বিকল করতে শুরু থেকেই সচেতন ছিল। পাকবাহিনী মনে করেছিল মেধাবী লোকগুলোকে হত্যা করতে পারলেই এই জাতির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে পদানত করে ফেলা যাবে। কিন্তু এতদিনে জাতির মননে স্বাধীনতা ও শোষণহীন রাষ্ট্রচিন্তা একেবারে গেঁথে গিয়েছিল। সুতরাং দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু এ জন্য যে মূল্য চুকাতে হল তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।
জাতি আজ বিনম্রচিত্তে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করবে। তাঁদের স্মরণ করবে। এই বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীনতার যে স্বরূপ জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরে এসে আজ হতাশার সাথে বলতে হয়Ñ শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনে এখনও আমরা সফল হইনি। এইদেশ থেকে এখনও দূর হয়নি দুর্নীতি, এখনও সম্পদের সমতা নিশ্চিত করা যায়নি, এখনও প্রতিটি মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। রক্তমূল্যে কেনা একটি দেশে এইসব প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক। আর এইসব প্রশ্ন উত্থাপনের মধ্য দিয়ে যদি আত্মেপলব্ধির জায়গাটি তৈরি হয় তাহলেই কেবল সার্থকতা পাবে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মদান।
শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

  • [১]