বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ১৯৭১ সালের সাহসী ছাত্রনেতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তালেব উদ্দিনের নামের ‘শহীদ তালেব ছাত্রাবাস’ এখন আর নেই। এই ছাত্রাবাসের স্থলে ৫ তলা বিশিষ্ট ভবনে হয়েছে ছাত্রীনিবাস-২, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ। কলেজ কর্তৃপক্ষসহ দায়িত্বশীলরা অবশ্য বলেছেন, আমরাও চাই শহীদ তালেবের নামে ছাত্রাবাস থাকুক। শীঘ্রই নতুন ৫ তলা ভবনের আরেকটি ছাত্রাবাস হবে, এর নামকরণ হবে ‘শহীদ তালেব ছাত্রাবাস’।
১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর পাকসেনারা চারদিক দিয়ে আটঘাট বেঁধে আক্রমণ চালানোর কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মঙ্গলকাটা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে পাশের গোধীগাঁও, নৈদেরখামার ও মীরেরচর এলাকায় এসে অবস্থান নিয়ে পাকসেনাদের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে তৎকালীন মহকুমা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা তালেব উদ্দিন এখানে আটকা পড়ে ধরা পড়েন। পাকবাহিনী সুনামগঞ্জ ছেড়ে যাবার সময় (৬ ডিসেম্বর’ ১৯৭১) সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের আহসানমারায় তালেবসহ ৩ জনকে এক রশি দিয়ে বেঁধে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীতে ফেলে যায়।
পরে জানা যায়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পশ্চিমপাগলা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা কৃপেন্দ্র দাস ও একজন বাগান শ্রমিক (হিন্দু সম্প্রদায়ের) ওখানে শহীদ হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মোতালেব সুনামগঞ্জ শহরের পাবলিক লাইব্রেরি’র নামকরণ করেন জগৎজ্যোতি পাঠাগার যা এখন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি, ভিডি হলের নামকরণ করেছিলেন শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তন এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয় শহীদ তালেব ছাত্রাবাস। বছর খানেক আগেও মুসলিম ছাত্রাবাসের সামনে শহীদ তালেব ছাত্রাবাস নামের সাইনবোর্ড ছিল।
পুরোনো মুসলিম ছাত্রাবাস ভেঙে ৫ তলা ভবনে করা হয় ছাত্রী নিবাস। এর প্রবেশ দ্বারে এখন ছাত্রী নিবাস- ২, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ উল্লেখ রয়েছে।
শহীদ তালেব উদ্দিনের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা সিলেট জজকোর্টের এডিশনাল পিপি সামছুল ইসলাম বলেন,‘আমার ভাই হিসাবে স্মৃতি ধরে রাখার দাবি নয়, একজন সাহসী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ছাত্রনেতার স্মৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও সুনামগঞ্জবাসীর।’
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র, সুনামগঞ্জ’এর আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে মেজর এম এ মোতালেব সুনামগঞ্জের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করেছিলেন। এরমধ্যে মুসলিম ছাত্রাবাসকে শহীদ তালেব ছাত্রাবাস নামকরণ করা হয়েছিল। ৫ তলার নতুন ছাত্রী নিবাস হওয়ায় ছাত্রীদের থাকার সুযোগ বেড়েছে। এটিও জরুরি ছিল। শহীদ তালেব উদ্দিনের নামের সাইনবোর্ড সরানোর আগে কেন সরানো হচ্ছে তা জানানো হলে ভাল হতো।
মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা আতম সালেহ্ বলেন, দ্রুত শহীদ তালেব’এর নামে ছাত্রাবাস দেখতে চাই আমরা। না হয় এ নিয়ে গণআন্দোলন হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, তালেব উদ্দিন মুক্তি সংগ্রামের দিনগুলোতে সাহসী ছাত্রনেতা ছিলেন। তার আত্মত্যাগে বাংলাদেশ হয়েছে। তালেবসহ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র শহীদদের নামে ওই কলেজের নানা স্থাপনার নামকরণ করা যেতে পারে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নীলিমা চন্দ বললেন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের আরও দুটি ছাত্রাবাস নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর একটির নামকরণ হবে শহীদ তালেব ছাত্রাবাস। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ৪ ছাত্রনেতা শহীদের নামেই আমরা সরকারি কলেজের বিভিন্ন ভবনের নামকরণ করতে চাই। এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। মুসলিম ছাত্রাবাস বা শহীদ তালেব ছাত্রাবাস ভেঙে ৫ তলা ভবনের ছাত্রী নিবাস হওয়ায় ওখানে এই নামটি সংযোজন করা যাচ্ছে না। নতুন এই ছাত্রী নিবাসের নামকরণ বেগম ফজিলাতুন্নেসা’র নামে হতে পারে বলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা গেছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেট’এর নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম বলেন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে দুটি ৫ তলা ছাত্রাবাস নির্মাণের জন্য মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান মহোদয়েরও তাগাদা আছে। আমরা এই দুই ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছি। আশা করি দ্রুতই এর বাস্তবায়ন হবে।
সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এ প্রসঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ছাত্রনেতা তালেব উদ্দিনের নামে অবশ্যই ছাত্রাবাস হবে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে দুটি ৫ তলা ভবনের ছাত্রাবাসের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধপত্র দিয়েছি। আশা করি শীঘ্রই এটি বাস্তবায়ন হবে।