- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শহীদ বুদ্ধিজীবী সোনাহর আলী প্রসঙ্গে

জেসমিন আরা বেগম
রক্তঝরা মার্র্চে আমার মামা মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান দুইজন শহীদের ছবি সন্নিবেশিত করে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন তা নিয়ে কিছু ইতিহাসসন্ধানী ফেইসবুক বন্ধু কিছুটা তকর্যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। তা অবলোকন করে একটু কষ্টবোধ হলো। কারণ এই ছবির ক্যাপশনের শহীদরা আমার বাবা ও বোন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের রক্তে বাংলার মাটির একটি অংশ রঞ্জিত হয়েছে। আমার বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী সোনাওর আলী শহীদ বুদ্ধিজীবী কিনা সেই প্রশ্নে যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে হয়, এই দুইজন বাবা মেয়ে মুক্তিযুদ্ধের বলি এবং বিনা অপরাধে হানাদার কর্তৃক নিহত কি না? সম্ভবত সেটা সবাই স্বীকার করবেন। এখন আসুন হানাদারের সংজ্ঞা কি তা জেনে নেই। যারা বিনা কারণে কারও বাড়ি আক্রমণ করে নিবির্চারে মানুষ হত্যা করে বাড়িঘর লুট করে অগ্নিসংযোগ করে তারাই হানাদার। আমার বাবা বোন পাঞ্জাবী হানাদার না বাঙালি হানাদার কর্তৃক শহীদ হয়েছিলেন তা আজ পর্যন্ত উদঘাটিত হয় নি এরা কারা ছিলো? পাক আর্র্মি ? না বিহারী ? না দলছুট ই পি আর যারা যুদ্ধে না গিয়ে লুটতরাজে লিপ্ত হয়েছিলো তা আজও নির্ণয় হয়নি। এই ঘটনা ঘটানোর পর তাদেরকে কেউ চিহ্নিত করে নি। আমার বাবা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন সেটা আমি বলছি না, বলেছিলেন কথা সাহিত্যিক শাহেদ আলী সাহেব এবং আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেব এবং সদ্য প্রয়াত বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, কমরেড বরুণ রায় সহ অনেকে। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব এমন কোন আন্দোলন ছিলো না যেখানে আমার বাবার সম্পৃক্ততা ছিলো না। সে যাই হউক তার শহীদ হওয়ায় তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী উপাধি দিয়েছিলেন তার সতীর্থরা। আমরা তার সন্তানরা এর জন্যে কোন তদবির করিনি। দাদাও করেননি  (গোলাম রব্বানী) মতিউর মামাও করেননি। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ১১ বৎসর কয়েক মাস । আমার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ৫/৬ বৎসরের সময়ের কথাও আমি অনর্গল বলতে পারি কাজেই প্রত্যক্ষ সাক্ষী অনেক আছে। আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখব পরে। আজ আমার বক্তব্য যেহেতু আমরা আমার বাবাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসাবে ঘোষণা করিনি, করেছিলেন তৎকালীন সর্বদলীয় কর্মী সম্মেলনের পক্ষে আব্দুর রইছ এমপি। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা সর্বসম্মতিক্রমে এবং ১৯৭২ সালে আমার বিধবা মায়ের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীর মানপত্র প্রদান করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন আব্দুর জহুর এম পি, আলফাত মোক্তার সাহেব, আছদ্দর আলী সাহেব, কমরেড বরুণ রায় সহ আরও অনেকে। আমরা শিশু হিসাবে তা দেথেছি। ১৯৭২ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে আমার বাবার নাম সহ্নিবেশিত হয় তখন কেউ কোন প্রশ্ন করেন নি।      
কারণ তখন উত্তর দেয়ার লোক ছিলো। ১৯৯৯ সালে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার বাবার নামে ডাকটিকেট অবমুক্ত করে বিশাল সম্মানে সম্মানিত করেন তখনও কেউ প্রশ্ন তুলেন নি। ইদানিং দু’একজন লেখক কিছু লিখা লিখেছেন যা এতোদিন আমি দেখেও ওভারলোক করেছি কারণ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলা একাডেমী স্মৃতি একাত্তর নামে কয়েকটি সংকলন ১৯৯৫ সালে বের করেছে তার সপ্তম খন্ডে আমার একটা লিখা আছে। যারা প্রশ্ন তুলেছেন তাদের আমি অনুরোধ করবো স্মৃতি ৭১ খন্ডগুলো পাঠ করার। এখানে শুখু শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী সন্তানদের লিখা। ৬০% উর্দ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী সন্তান বলতে পারে নাই তাদের আপনজনকে কে হত্যা করেছিলো। শুধু ঢাকার নয় প্রতি জেলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী আছেন এবং তারা স্বাধীনতা পাগল ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারের হাতে প্রাণ দেন। এই হানাদাররা কারা ছিলো আজও তার প্রজন্ম জানে না। আপনারা কি তাদের সম্বন্ধেও প্রশ্ন তুলবেন ? জহির রায়হান যুদ্ধ পরবর্তীকালে শহীদ হন, তিনিও শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকায় আছেন আপনারা কি তার সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলবেন? ১৯৭১ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর ঢাকা ইউনিভার্সিটির কোয়ার্টার থেকে যেসব শিক্ষকদেরকে তুলে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় তারা তখনও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পাকিস্তান সরকারের অধীনে শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু অন্তরে বাংলাদেশ বহন করতেন বলে তাদের শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে সম্মান দেয়া হয়। তাদের সন্তানরাও জানে না তাদেরকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কারা হত্যা করেছে। হানাদার বাহিনী হত্যা করেছে সেটাই প্রতিষ্ঠিত সত্য। সুনামগঞ্জে আমার বাবাকে তাঁর সতীর্থরা তার যুদ্ধকালীন সময় ও পূর্ববর্তীকালীন সংগঠকরা শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসাবে চিহ্নিত করেন এবং রাষ্ট্র তাঁকে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সম্মানে সম্মানীত করা সত্বেও সুনামগঞ্জের কিছু কিছু ইদানিং কালের লেখক আমার বাবার নামের আগে শহীদ বুদ্ধিজীবী কথাটি লিখেন নাই। এটা তাদের মানসিক দৈন্যতার পরিচায়ক। এক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই। যারা আমার বাবাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে চান না তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক যারা আমার বাবাকে এই সম্মান দিয়েছেন তাদের কাউকে কোন প্রশ্ন না করে তারা প্রায় সকলে মৃত্যুবরণ করার পর হঠাৎ এই বিষয় নিয়া তর্ক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সঠিক নয়। আমরা শহীদের সন্তান হিসাবে কোন দিন আপনাদের কাছে কিছু চাই নি আমার মাও চাননি। দয়া করে আমার দেশ অন্ত:প্রাণ পিতার আর রক্তস্নাত ৯ বৎসরের বালিকা সিতারার শহীদ হওয়া সম্পর্কে তর্কযুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকুন আর সারা বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবানোলেখ্য পড়ে নিজ অঞ্চলের এই শহীদদের সম্বন্ধে মতামত দিন।
আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যারা আমার বাবাকে হত্যা করেছিল তারা শেষ রাতে বাড়ি ঘেরাও করেছিল। আমরা খালিক মিয়ার ঘরে ছিলাম না। তার পার্শ্ববর্তী তার ভাই কদর মিয়ার ঘরে ছিলাম। আমার বাবা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার ওজু করতে বেরিয়েছিলেন এবং হানাদারকে দেখে ঘরে ঢুকেছিলেন। গুলিবৃষ্টি ও ব্রাশ ফায়ারে আমরা সকলেই পড়ে গিয়েছিলাম। আমার আব্বাকে গুলি করার পর আমার বোন সিতারা আমার আব্বাকে মেরো না বলে গলা জড়িয়ে ধরেছিল। তার ঘাড়েও গুলি করা হয়েছিল। হানাদারদের বড় গোফ ছিল। তারা উর্দুভাষায় আব্বার কাছে না যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছিল এবং সিতারা এবং আব্বার লাশ যখন জড়াজড়ি অবস্থা থেকে আলগা করেছিল তখন আব্বার ঘড়ি ও আংটি তার পকেটে পুরেছিল। এবং তৎপর তারা ঘরে আগুন দিয়েছিল। যার কিছু অংশ পরে আমার বাবার মাথার চুল পুড়ে গিয়েছিল। তাদেরকে যারা মুক্তিযোদ্ধা বলেন তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করেন।
ফেইসবুকে সৈয়দ আজম একটি স্ট্যাটাসে লিখেন,‘যে শহীদ বুদ্ধিজীবী অ্যাড. সোনাহর আলী শহীদ বুদ্ধিজীবী ছিলেন এবং রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছেন তা সত্য। তার নামে ডাকটিকেট বেরিয়েছে তাও সত্য। কিন্তু এত সত্যের মধ্যে একটি মিথ্যা বারবার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কেন বোধগম্য হচ্ছে না। উনি শহীদ হয়েছেন তবে পাকবাহিনীর হাতে নয় ভুলবশত: মুক্তিযোদ্ধার হাতে।’Ñএই বাক্যটির একটি ব্যাখ্যা দিতে চাই। তিনি পাকবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন তা কেউ দাবি করছে না তবু ভুল বশত: মুক্তিযোদ্ধার হাতে তিনি নিহত হননি। যারা এ কথা লিখেন তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করেন। তারা কত বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তা আমি জানি না। তবে নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে এত বড় কলঙ্ক লেপে দেয়া গর্হিত অপরাধ। আসুন ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। তার পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা গঠিত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে যে যেভাবে পেরেছে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর জেনারেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের জন্ম হয় এবং সম্ভবত বালাটে মে মাসের প্রথম কি দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম দল ট্রেনিংয়ে যায়। আমার বাবা হানদারের হাতে নিহত হন ১লা মে ১৯৭১। যখন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্মই হয়নি। হানাদারদেও কৃত পাপকে কি কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের পাপ বলে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছেন তা আমি জানি না। আমি আবারও বলছি এ হানাদাররা ফুল আর্মির ড্রেসে ছিল। সামান্য বন্দুক বা রাইফেল নয় ব্রাশফায়ার করার মতো অস্ত্র ছিল, মুখে উর্দু বুলি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বা পরে এদের কেউ ডিটেক্ট করতে পারেন নি। তখন রাজাকারও সৃষ্টি হয়নি। তবে হ্যাঁ আমার বাবা এবং তৎকালীন আওয়ামীলীগের কোষাধ্যক্ষ আমার নানা মতছিন আলী কিশোরগঞ্জ দিয়ে খালিক মিয়া সহ ইন্ডিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন এবং শ্যামারচর গ্রামে কিছু মানুষ লেফটরাইট করিয়ে প্রস্তুত করছিলেন। এই কারণে কারো গাত্রদাহ হতে পারে কিনা আমি জানি না। তবে দয়া করে হানাদারদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করবেন না। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনালেখ্য পাঠ করে নিজ এলাকার এই শহীদ বুদ্ধিজীবী ও তাঁর সন্তানের রক্তের সম্মান দিন। আজ স্বাধীনতার দিনে আপনাদের কাছে আমার এই অনুরোধ।
লেখক: শহীদ বুদ্ধিজীবী সোনাহর আলীর কন্যা ও জেলা জজ।

  • [১]