- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শহীদ মিনারের নামফলক বিলোপায়ন প্রসঙ্গে

ইকবাল কাগজী
‘বি. দ্র. : গানটির গীতিকার ও সুরকার বাউল কবি আব্দুর রহিম। তিনি এই গানটি ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের বাসীন্দা। স্বাধীনোত্তরকালে জনপ্রিয় এই গানটি তিনি প্রায়ই বেহালা বাজিয়ে গাইতেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী সহকারী।’ বইয়ের পা-ুলিপির শুরুতেই গানটি উদ্ধৃত করে শেষে এই কথা কটি লিখে রেখেছেন, মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান। গানটির শিরোনাম ‘স্বাধীনতার গান’। প্রথম দুটি চরণ : ‘স্বাধীন দেশে বাস করিব পাব না আর কোন ব্যথা।/ স্বাধীন জনতা আমরা স্বাধীন জনতা ॥’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একজন কবির সহজিয়া সরল উচ্চারণ। এই কথাটি বলার জন্য বাঙালি অপেক্ষা করেছে হাজার বছর ধরে। তারপর বলতে পেরেছে। আর বলার আগে প্রাণ দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষ। এই গানের ১৯ ও ২০ ক্রমিক চরণে কবি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগে সিট না পাইয়া শেষে হয় পাঞ্জাবীর কুত্তা।/ এ রহিম কয় মিথ্যা নয় ভাই বলছি সত্য কথা ॥’
কবির এই উচ্চারণের পর অনেক কাল কেটে গেছে। কবি ইতোমধ্যে এই ধরাধাম থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। ইতোমধ্যে সরাবতীর ধারায় অনেক জল গড়িয়েছে। ১৯৭৫-য়ের বিয়োগান্ত ঘটনা ও ২০০৪-য়ের গ্রেনেড হামলা ঘটে গেছে। এমনকি ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট একযোগে সারা দেশের পাঁচশ স্থানে সিরিজ বোমা হামলা করে শক্তি প্রদর্শনের মহড়াও সম্পন্ন হয়েছে। কী হয় নি ? হয়েছে অনেক কীছুই। মসনদেও বসেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। এবার সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নামফলক মুছে দিয়েছে। এই নাম লোপায়নব্রতীদেরকে পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে দুর্বৃত্ত রূপে। তা পত্রিকায় তো অনেক কীছুই লেখা হয়, এমন কি যাচ্ছেতাই পর্যন্ত। কিন্তু লোপায়নব্রতীদের নামলোপায়নকর্মের ফলে কবির ‘স্বাধীন দেশে বাস করিব পাব না আর কোন ব্যথা।/ স্বাধীন জনতা আমরা স্বাধীন জনতা ॥’ এই উচ্চারণের ব্যত্যয় ঘটেছে, সে-মর্মান্তিকতার প্রকাশ নেই পত্রিকার প্রতিবেদনে। পরপারের এ রহিম কি শহীদ মিনারের নামফলক মুছে দেওয়ার ফলস্বরূপ কষ্ট পাচ্ছেন? জানি না। কিন্তু কবির উচ্চারিত সত্য ‘আওয়ামী লীগে সিট না পাইয়া শেষে হয় পাঞ্জাবীর কুত্তা।/ এ রহিম কয় মিথ্যা নয় ভাই বলছি সত্য কথা ॥’ অর্ধশতাব্দী পরেও অনলপ্রভার মতো জ্বলে উঠে সত্যিকেই প্রতিভাত করে। ঘটনার প্রেক্ষিতে কারও নিন্দামন্দ করতে চাই না। কেবল প্রশ্ন করি, এই শহীদ মনিারের নামফলক মুছে দেওয়ার অপমান কার বিরুদ্ধে প্রযুক্ত ? শহীদদের বিরুদ্ধে ? যে-শহীদরা দেশটিকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন তাঁদের বুকের তাজা রক্ত এই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে। এই শহীদ মনিারের নামফলক মুছে দেওয়ার অবির্মষ্যকারিতা কার বিরুদ্ধে ? দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ? যারা কবি এ রহিমের মতো একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিল একাত্তরে। যে-স্বপ্ন এই দেশের ভূমিপুত্রগণের হাজার বছরের স্বপ্নসাধনার ফল : ‘স্বাধীন দেশে বাস করিব পাব না আর কোন ব্যথা’। এই অবিমৃষ্যকারিতা দেশের মানুষের মনে ব্যথা দেওয়ার জন্যে ? পুরনো ঘায়ে খোঁচা দিয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করার জন্যে ? আর এই সব করা হচ্ছে অর্ধ শতাব্দী পরে।
সত্যি, একেই বলে, ভবী ভুলবার নয়। পরাজয়ের গ্লানি তারা ভুলে যায় নি। কিন্তু বিপরীতভাবে এই দেশের মানুষেরও একটা ভবী বিদ্যমান। এই ভবীটা স্বাধীনতার, এই ভবীটা মুক্তির, এই ভবীটা সর্বাবস্থায় সর্বকালে দাসত্ববিরোধী, এই ভবীটা কেবল ভালোবাসার, এই ভবীটা ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, এই ভবীটা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। এই দেশের মানুষের জন্যে এই ভবীটাই সত্যি। এই জেদের জোরেই প্রয়োজনে আবার ৩০ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন দিতে তারা কসুর করবে না। প্রস্তুত আছে প্রতি মুহূর্তেই। প্রয়োজনে আবার একটা ৭ মার্চের ভাষণ হবে, জন্মান্তর হবে বঙ্গবন্ধুর। এমন যদি না হয় তবে এই বাংলাদেশে কোনও বাঙালি বাস করে না, এমন যদি না তবে এই বাংলাদেশের মাটি একুশে ফ্রেব্রুয়ারিতে কোনও বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয় নি, এমন যদি না হয় তবে এই বাংলাদেশের মাটি একাত্তরে ৩০ লক্ষ বাঙালির রক্তে ধৌত হয়ে পবিত্র হয় নি, এমন যদি না হয় তবে এই বাংলাদেশে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-জয়নুলের জন্ম হয় নি, এমন যদি না হয় তবে এই বাংলাদেশে কোনও শেখ মুজিবের জন্ম হয়নি।
শহীদ মিনারে এই আক্রমণের মূল তাৎপর্য কী ? এ রকম একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে। সহজ অনুমানে যে-কারও সহজ হৃদবোধ হতে পারে যে, এখানে একটি দখল প্রক্রিয়া চলছে। শহীদ মিনারের স্থানটিকে কেউ কেউ দখল করে তাতে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করে নিজের জন্যে অর্থ আয়ের সহজ রাস্তা করে নিতে চান। ইতোমধ্যে মুৎসুদ্দিমতলবি একটি দখল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। এমন বাণিজ্যিকতাই কেবল নয়, এর পেছনে রাজনীতিকতাও আছে। অদূর অতীতে কোন কোনও জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছিলেন। পত্রিকা খোললে হয় তো তার হাদিস মিলতে পারে। স্থানটা খালি হলে বাণিজ্য-বসতি-লক্ষ্মী জাতীয় আর্থনীতিক প্রাপঞ্চিকতার উড়ে এসে জুড়ে বসার সুন্দর একটি মওকা তৈরি হতে পারে। সত্যি, এই না হলে রাজনীতি হয় কী করে ? অধুনাতন রাজনীতি বড়বেশি বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে, জানা কথা। কিন্তু সে-রাজনীতি মাঠে মারা গেছে এবং মাঠে মার যাবে, এবং শহীদ মিনারের এই নামফলক মুছে দেওয়ার অবিমৃষ্যকারিতাটিও। প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকবেন শহীদের স্বজনরা, অতীতে যেমন ছিলেন, তাতে কোনও ভুল নেই।

  • [১]