মুশফিকুর রহমান
ক্রেতার অপেক্ষায় শাক নিয়ে শহরের কোর্ট পয়েন্টের সামনে সড়কে বসে আছেন রহিমা বেগম। শাক বিক্রি করে যে টাকা পান তা দিয়েই সংসার চলে রহিমার। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা রহিমার জীবন শুরু থেকেই কষ্টের। ছয় ভাই-বোন লালনপালন করতে গিয়ে তাঁর মা-বাবাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। রহিমার বিয়ে হয় ২০ বছর বয়সে। দুই সন্তান রেখে মারা যান তাঁর স্বামী। এর পর থেকে শুরু তাঁর সংগ্রামী জীবন। টিকে থাকতে রহিমা দিনমজুরের কাজ করেছেন। করেছেন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ।
রহিমা বলেন, বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন এবং বড় ছেলে বিবাহ করে পৃথক ঘর সংসার করেছে। ছোট দুই সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন রহিমা বেগম। সুনামগঞ্জ শহরের সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনের সড়কের পাশে পিঠা বিক্রি করেছেন দীর্ঘদিন। এখন রমজান মাসের জন্য পিঠা বিক্রি বন্ধ। শাক বিক্রি করে খাবারের ব্যবস্থা করছেন। তিনি বলেন, এক মেয়ে সুমাইয়া আক্তার শহরের বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ৩ বছরের খাতিজাকে সাথে নিয়েই সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে শাক বিক্রি করছেন। তবে বর্তমানে শাকের উৎস কমে যাওয়ায় তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ শাকই যে তাঁর রুটিরুজি ও বেঁচে থাকার অবলম্বন।
তিনি জানান, রহিমা বেগমের বাবার বাড়ি ছিল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মথুরকান্দি গ্রামে। স্বামীর বাড়ি ছিল সুনামগঞ্জ পৌর শহরের তেঘরিয়ায়। রহিমা বেগমের বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় রহিমা বেগম। কিশোরী বয়সে বাবা পাগল হয়ে যান। এরপর মা আনোয়ারা বেগম সংসারের হাল ধরেন।
গত সোমবার বিকালে সুনামগঞ্জ শহরের কোর্ট পয়েন্টে সড়কের পাশে শাক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমার সাথে কথা হয়। তিনি জানান, প্রতিদিন বিকালে সড়কের এক প্রান্তে ফুটপাতে বসে শাক বিক্রি করেন। গতকাল বিকালে নিয়ে এসেছিলেন ১৬ মুঠি হেলেঞ্চাশাক ও থানকুনি পাতা। প্রতি মুঠি ১০-১৫ টাকা বিক্রি করেন। হেলেঞ্চা ও থানকুনি পাতা ছাড়া মাঝেমধ্যে কলমিশাক, কচু ও কচুর লতিও বিক্রি করেন। সড়কের ধারে, মানুষের বাড়ির আশপাশে ও পতিত জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাক তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
রহিমা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। দুটি সন্তানও হয়েছে। প্রথম স্বামীর এক ছেলে, এক মেয়ে। দ্বিতীয় স্বামীর দুই মেয়ে। তিন বছর হয় দ্বিতীয় স্বামী আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর আর খোঁজখবর নেননি। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। বড় ছেলে বিবাহ করে পৃথক ঘর সংসার করছে। এখন দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার। তিন বেলা খাওয়া ও শহরে ঘরভাড়ার খরচ জোগাতে সকাল ছয়টায় শাক কুড়ানো শুরু করি। এরপর বিক্রি শেষ করতে রাত নয়টা বেজে যায়। শাক বিক্রি করে প্রতিদিন ২০০-২৫০ টাকা আয় হয়। তা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে চলি। বর্তমানে কুড়ানো শাকের উৎস কমে যাওয়ায় চিন্তায় আছি।
রহিমা বেগম বলেন, এইভাবে কয়দিন চলব। যদি সরকার আমাকে একটা ঘর করে দিত, তাহলে নিজের ঘরে থাকতাম। হাঁস, মোরগ পালতাম, আর্থিক সহায়তা পেলে মুদির দোকান দিতাম। ভবিষ্যতের একটা উপায় হত।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশের কেউ যেন গৃহহীন, ভূমিহীন না থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি গৃহহীনদের গৃহ, ভূমিহীনদের ভূমি বিতরণ করছেন। মুজিববর্ষের ঘর নির্মাণ সহ দুই শতক করে জমিও দিচ্ছেন। যাতে করে তারা জমি চাষ করে ফসল উৎপাদন করে চলতে পারে, স্বাবলম্বী হতে পারে। একইভাবে কেউ যদি স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে, সে যদি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে, তাহলে সহায়তা করা হবে।