ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের পাশপাশি তিন ওয়ার্ডে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এ কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে পাঁচ শতাধিক শিশু শিক্ষার্থী। এই তিন ওয়ার্ডে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুদের ঝড়ে পড়ার সংখ্যা। গ্রামগুলোতে বাড়ছে শিশুশ্রম। যদিও ওয়ার্ডগুলোতে মাদ্রাসার নূরানী শিক্ষা ব্যবস্থা ও নামমাত্র বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এলাকাবাসীর দাবি, ৩ ওয়ার্ডের জন্য ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
জানা যায়, শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের এক, দুই ও তিন নম্বর ওয়ার্ডের ইনাতনগর, চন্দ্রপুর, নবীনগর, রায়পুর, ইসলামপুর, কাদিপুর, শরীয়তপুর ও ডাবর সংলগ্ন রহমতপুর গ্রামে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাদিপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় এবং বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রায় পাঁচ বছর আগে বিদ্যালয়ের নামে ২৮ শতাংশ ভূমিও দান করেন কাদিপুর গ্রামের বিশিষ্ট মুরব্বি কমর উদ্দিন। গত বছর গ্রামবাসীর অর্থায়নে আরো ৫ শতক ভূমি ক্রয় করা হয় বিদ্যালয়ের নামে। বিদ্যালয়টি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো হয় নি।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৫টি প্রাথমিক স্কুলের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাছে একটি চাহিদাপত্র বা বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য একটি আবেদনপত্র পাঠানো হয়েছে। সে চাহিদাপত্রে কাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের তিন নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আজাদুল হক আজাদ বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠা হোক এটা কাদিপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। ৫ বছর আগে স্কুলের জন্য ২৮ শতক জায়গা দান করেছেন কমর উদ্দিন। গ্রামবাসী তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আরো ৫ শতক জায়গা কেনা হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা প্রস্তুত। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি স্কুলের বিষয়ে একটি সুখবর ওয়ার্ডবাসী পাবেন।
একই বিষয়ে জোরালো দাবি তুলেছেন ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড রায়পুর, চন্দ্রপুর এবং এক নম্বর ওয়ার্ডের চন্দ্রপুরের একাংশ, ইনাতনগর, নবীনগর ও ডাবর সংলগ্ন রহমতপুর গ্রামবাসী। তাদের দাবি, পাগলা বাজার সংলগ্ন পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইনাতনগর গ্রাম। দুই কিলোমিটার দূরে ডাবর, এক কিলোমিটার দূরে নবীনগর ও অর্ধ কিলোমিটার দূরে চন্দ্রপুর গ্রাম। বাজারের পূর্ব প্রান্তে রায়পুর। এর ভিতরে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তাই প্রাথমিকের শিশু শিক্ষার্থীরা পাগলা বাজার বাসস্টেশন পার হয়ে এতো দূরের স্কুলে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
এছাড়াও, হাওরিয়া অঞ্চল সুনামগঞ্জের এই উপজেলায় বছরের প্রায় দুই মাস থাকে বন্যা। তখন শিশুরা তো দূরে থাক বড়দের চলাচলে সমস্যা হয়। প্রায় ৪ মাস থাকে বৃষ্টির মৌসুম। এজন্য দূরের গ্রামগুলো থেকে স্কুলে আসতে চায় না শিশু শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে, বাড়ছে শিশুশ্রম। যদিও এসব এলাকায় দু’টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তবে মানসম্মত শিক্ষার অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
ইনাতনগর, নবীনগর, চন্দ্রপুর, রহমতপুর ও ডাবরের একাধিক বাসিন্দা জানান, শুধুমাত্র ১ নম্বর ওয়ার্ডেই প্রাথমিকের শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ শ’এর বেশি। দুই নম্বর ওয়ার্ডে এই সংখ্যা আরো বেশি হবে। এই শিশুদের কেউ কেউ বেসরকারি, নানান এনজিওতে ভর্তি থাকলেও অনেকে আছে লেখাপড়ার বাইরে। যে দু’টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তাতে নেই কোনো প্রশিক্ষিত শিক্ষক। ফলপ্রসূ পাঠদানের অভাবে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার আগেই ঝরে যায় অনেকে শিশু।
ইনাতনগর গ্রামের বাসিন্দা শমসুল হক, আজিজুল হক, সৈয়দুর রহমান, মামুনুর রশিদ মামুন ও সজরুল ইসলাম বলেন, আমরা (৩নং ওয়ার্ডবাসী) অত্যন্ত অবহেলিত ও দুর্ভাগা। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে এতো বড় একটি গ্রাম যেখানে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। আমাদের এই এলাকার মানুষ এগিয়ে যাবে কীভাবে? আমাদের গ্রামে তো স্কুল নাই-ই, সাবেক এক নম্বর ওয়ার্ডে (বর্তমান ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড) কোনো সরকারি স্কুল নেই। তিন নম্বর ওয়ার্ডে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী আছে যারা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। ইনাতনগর গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানালেন তিনি।
স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে সম্মতি জানিয়ে পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের এক নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. আলী আহমদ বলেন, আমরা চাই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হোক। রায়পুর, চন্দ্রপুরেও (২নং ওয়ার্ড) কোনো স্কুল নেই। আমরা চাইছি দুই ওয়ার্ডের শিশুরা পড়তে পারে সে অনুযায়ী একটি সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠা হোক।
স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যপারে একমত প্রকাশ করেন ইউনিয়ন পরিষদের দুই নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সদস্য জফর মিয়াও।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের দুইজন মেম্বার আলী আহমদ ও জফর মিয়া আমার কাছে এসেছিলেন। আমিও চাই স্কুল হোক, এটা আমারও দাবি। তাদেরকে বলেছি- যত ধরণের সহযোগিতা করা লাগে সব ধরণের সহযোগিতা করবো।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সো. সেলিম খান বলেন, স্কুলের বিষয়ে কথা বলতে ইনাতনগর গ্রামের লোকজন আমার কাছে এসেছিলেন। তাঁদেরকে পরামর্শ দিয়েছি ইউএনও স্যারের কাছে একটি আবেদন করতে। আমরা দেখবো। ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী কমপক্ষে ১শ ৫০ শিক্ষার্থী থাকলে এবং অপর স্কুলের ২ কিলোমিটারের ভিতরে অন্য কোনো স্কুল না থাকলে আমরা আবেদন পত্র পাঠাবো। বিদ্যালয়হীন গ্রামে ১০০০ বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প নামের একটি প্রকল্প চালু আছে। তারা আবেদন করলে আমরা আবেদনের প্রেক্ষিতে আরেকটি আবেদন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, স্কুল স্থাপন হোক এটা আমরাও চাই। কাদিপুরের স্কুলের নাম ইতোমধ্যে চাহিদা পত্রে দেওয়া আছে। একই মন্তব্য করেন ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক নূর হোসেন।