ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শাহজাহান মিয়া। পেশায় একজন সিএনজি চালক। পাগলা বাজার সংলগ্ন ডাবর পয়েন্টের ঠিক উত্তর দিকে হাওরে তাকালে দেখা যায় তার বাড়ি। এখনো ডুবন্ত। ভেঙে পড়েছে পুরোটা। যেনো সমুদ্রের বুকে একখানা দ্বীপ। বাড়িতে থাকার অবস্থা নেই, পানির স্রোত বয়ে গেছে চালের উপর দিয়ে। তাই আশ্রয় নিয়েছেন ডাবরের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পাশের ভবনে। তিন মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে ৬ জনের সংসার। বাড়ি ফেরার কোনো সুযোগ নেই, তাই চালক শাহজাহানের স্ত্রী—সন্তান নিয়ে এবারের ঈদ কাটাতে হবে নির্জন এ ভবনে।
ডাবরের মহাসিং নদীর তীরবর্তী সরকারি একাধিক ভবনে আরো ১২/১৩টি পরিবার বসবাস করছেন। তাদের প্রত্যেকের অবস্থা শাহজাহানের মতো না হলেও কোনো অংশে কমও নয়। বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমেছে ঠিক কিন্তু ভেসে উঠেনি রাস্তা। কিংবা ঘরের বাঁশ—পালা এতো দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, সেগুলো পরিবর্তন না করে ঘরে উঠলে যে কোনো সময় ধ্বসে পড়তে পারে ঘর। অথবা প্রচণ্ড ‘আফালে’ ঘরের বেড়ার টিন, চালের টিনের ক্ষতি করেছে খুব বেশি। কারো আবার এখনো ভেসে উঠেনি ঘর। এসব কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না তারা। তাদেরও ঈদ কাটবে আশ্রয় কেন্দ্রে।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজে বন্যার সময় ৩ শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলো। পানি কমার সাথে সাথে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় সকলেই। তবে এখনো রয়ে গেছে ১০/১২টি পরিবার। তাদের বাড়ির অবস্থাও ভালো নেই। সব কিছু প্রস্তুত করেই বাড়ি ফিরবেন তারা। তাই এ বছর ঈদ উল আযহা তারা পালন করবেন পাগলা হাইস্কুল আশ্রয় কেন্দ্রে।
পাশেই রাইজিং সান কিন্ডার গার্টেন। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এখনো ৩টি পরিবার বসবাস করছেন। ঈদের পরে বাড়ি—ঘর প্রস্তুত করে তবেই বাড়ি ফিরবেন। এভাবে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন মানুষ। ঈদ করবেন আশ্রয় কেন্দ্রে থেকেই।
এবারের বন্যায় শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত অগণিত পরিবার। কারো কম, কারো বেশি, কারো আবার বর্ণনাতীত ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সময়ের ব্যাপার। তবু বাড়ি ফিরেছেন মানুষ। যারা বাড়িতে যেতেই পারছেন না, তাদের ঈদ হবে যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে।
এছাড়াও উপজেলার সুনামগঞ্জ—সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে এখনো বসবাস করছেন বন্যার্তরা। তারাও ঈদ করবেন রাস্তার পাশে। যদিও তাদের বসবাস নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সড়কের পাশে থাকলে ত্রাণ কিংবা নগদ অর্থ সহায়তা মিলছে বিধায় কেউ কেউ ইচ্ছা করেই থাকছেন রাস্তার পাশে। আবার অনেকে বলছেন— বাড়ি ঘর থেকে পানি নামলেও মাটির ঘর থাকায় এখনো বসবাসের উপযোগি না হওয়ায় বাড়ি যাচ্ছেন না মানুষ। ইচ্ছা করে কেউ বাস্তুভিটা হারা হয় না।
ডাবরের রহমতপুর গ্রামে বসবাস চা বিক্রেতা আবদুল মছব্বিরের। পানিতে এখনো ডুবে আছে ঘর। আশ্রয় নিয়েছেন পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজে। তিনি বলেন, আমি নিম্ন আয়ের একজন মানুষ। পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি। প্রায় সবাই অসুস্থ। বাড়ি—ঘর এখনো পানির নিচে। বাড়ি যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এবারের ঈদ আশ্রয় কেন্দ্রেই উদযাপন করতে হবে।
মৃত আবদুল কাদিরের স্ত্রী, তার মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতনিকে নিয়ে প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন পশ্চিম পাগলা উপ—স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। এখন আছেন রাইজিং সান কিন্ডার গার্টেনে। তার ঘর থেকে পানি নামলেও এখনো স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের মেঝে। ঘর শুকানোর পর বাড়ি ফিরবেন। তাই আর ঈদের পরেই বাড়ি ফিরবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান বলেন, গতকালও (বৃহস্পতিবার) ডাবর আশ্রয় কেন্দ্রে বন্যার্তদের খাদ্য সহায়তা করেছি। মোটামুটি ভালো মানের খাদ্য তারা পেয়েছেন। ঈদের দিনও যারা আশ্রয় কেন্দ্রে থাকবেন তাদেরকেও একটু ঈদ সামগ্রী দেওয়ার চিন্তা মাথায় আছে। যেনো ঈদের দিনে একটু হলেও যেনো ভালো খাদ্য তারা খেতে পারেন।