- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শান্তিগঞ্জে কুস্তি খেলায় হাজারো মানুষের ঢল

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
আরেকজন আইছইন বা। এইনের বাড়ি জীবদারা। ভালা খেলইন। ‘মাল’ হিসাবে বাক্কা সুনাম আছে তাইনের। দেখি তাইন কিতা খরইন। কথাগুলো বলছিলেন খেলা দেখতে যাওয়া দর্শনার্থী, জয়কলস ইউনিয়নের কামরূপদলং গ্রামের প্রবাস ফেরত মো. জাকিরুল ইসলাম সিদ্দিকী। এমন সময় চতুর্দিকে তোহা তোহা চিৎকার শুরু হয়। তোহা একজন কুস্তিগির।
স্থানীয় ভাষায় কুস্তিগিরদের মাল বলে। একসাথো হাজারো কণ্ঠে তোহা নামে প্রকম্পিত হয় খেলার মাঠ। প্রতি বছরের এমন দিনে (ভাদ্র-আশ্বিন মাসে) এরূপে সাজে শিমুলবাক ইউনিয়নের সাতগাঁও জীবদারা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটি। কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে মাঠটিতে। এ বছরের খেলায় (১২ সেপ্টেম্বর, সোমবার) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের কুস্তিগির খেলেছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের জীবদারা ও উকারগাঁও গ্রামের কুস্তিগিরদের বিরুদ্ধে। ৫০ থেকে ৬০ জন কুস্তিগির খেলেছেন প্রথম ধাপে। দ্বিতীয় ধাপে মোহনপুরের ৮জন কুস্তিগিরকে হারিয়ে জয় লাভ করে শিমুলবাক-উকারগাঁওয়ের সাত কুস্তিগির। বিজয়ী কুস্তিগিরেরা হলেন- শিমুলবাকের তোহা, কবির হোসেন, পুষ্প, সুজন ও উকারগাঁওয়ের এমরান, আজিজুল হক ও অজুদ মিয়া। তবে, খেলায় বিজয়ীদের পুরষ্কার দেওয়ার কোনো রীতি চালু নেই। সকল খেলোয়ার ও আমন্ত্রিত অতিথিদের শুধুমাত্র খাওয়া-দাওয়া করানো হয়।
খেলা আয়োজক কমিটির অন্যতম একজন ফরিদ আহমেদ। তিনি জানান, শত বছর ধরে তাদের গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ঐতিহ্যবাহী এ খেলাটির আয়োজন করেন উকারগাঁও ও জীবদারা গ্রামবাসী। নবীন-প্রবীণদের সমন্বয় করেই ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আমরা খেলাটির আয়োজন করে থাকি। বোরো ধানের জালাচার (ধানের বীজতলা) এখনো ডুবে আছে। বীজতলা ভেসে উঠলে সবাই বৈশাখী ক্ষেতে কাজে নেমে পড়বে। আর কারো কোনো অবসর সময় থাকবে না। এখন কাজ তুলনামূলক কম, তাই গ্রামে নির্মল একটি আনন্দের ব্যবস্থা করি আমরা।
তিনি জানান, এ খেলায় খুব একটা প্রচারণাও আমরা করি না। তবু হাজার হাজার দর্শক আসেন খেলাটি দেখতে। গতকাল প্রায় ৫ হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছিলো। মাঠের চারদিকে ছিলো শুধু মানুষ আর মানুষ। ছিলো মানুষের ছাতা। হৈ-হুল্লোর আর উপরি দোকানিদের বিক্রির ব্যস্ততা। গ্রামের মধ্যে এক আনন্দের পরিবেশ ছিলো সারাটা দিন। খেলায় হারজিত আছে, থাকবেই। তবে আমাদের এখানো কাউকে পুরষ্কার দেওয়ার কোনো রেওয়াজ নেই। যাদেরকে আমরা আমন্ত্রণ জানাই তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে আদর আপ্যায়ন করি, ডাল-ভাত যা পারি তা খাওয়াই। অনেক আনন্দ হয় দুই গ্রামে।
খেলায় মোহনপুরের সাথে জীবদারা-উকারগাঁওয়ের খেলা হয়। সহস্রাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। অনেক আনন্দ হয় সারাদিন। কালের ঐতিহ্যবাহী এ খেলার প্রতি এখনো টান ফুরোয় নি গ্রামীণ মানুষের। এটা আমাদের আত্মার আনন্দের। আমাদের গ্রামে এমন আনন্দ ব্যবস্থা চলমান থাকুক কাল থেকে কালন্তর। কথাগুলো বলছিলেন- জীবদারা গ্রামের যুবক আকিক আহমেদ।

  • [১]