- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শান্তিগঞ্জে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ হাতপাখা

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
কোনোটায় থাকে ভালোবাসার প্রতীক, কোনোটায় লেখা থাকে ভুলনা আমায়। আর কোনো কোনোটায় লেখা থাকে মা-বাবা দোয়া কিংবা বাবা আমার জান্নাত। এমন সব আকর্ষণীয় নকশা করা লেখায় বা চিত্রে বাহারি রকমের হাতপাখায় ফুটে উঠতো পরিবারের কারো না কারো মনে কথা। বহিঃপ্রকাশ ঘটতো মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার। বিবাহে বধূ বিদায়ের সময় মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মনে রাখতে নকশা করা অন্যান্য জিনিসের সাথে শখের হাতপাখাও স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যেতো। শতশত বছর এমনই এক চলমান প্রথার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করেছেন এদেশের গ্রামীণ জনপদের মানুষেরা। কিন্তু বিদ্যুৎ, আধুনিকতা আর রিচার্জেবল ফ্যানের যুগে হাতপাখা এখন বলতে গেলে বিলুপ্ত প্রায়। মানুষ এখন এতটাই অলস হতে চলে যে, হাত ঘুরিয়ে বাতাস খেতে চান না আর। বছর দশেক আগ পর্যন্তও গ্রামীণ লোকশিল্পের আড়ম্বরপূর্ণ ঐতিহ্যের জীবন্ত শিল্প হাতপাখা গ্রাম এমনকি শহরের প্রতিটি ঘরে ঘরে পাওয়া যেতো; যা এখন হারিয়ে যাওয়ার অসম্ভব প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তবু কিছু মানুষের হাত ধরে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে শিল্পটি যেনো বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
শখের এই লোক শিল্পের বিষয়ে কথা হয় শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বেশ কয়েকজন নবীন-প্রবীণের সাথে। প্রবীণ মুরব্বি রজব আলী জানান, একটা সময় বৈদ্যুতিক ফ্যানের এতো আধিক্য ছিলো না। মানুষ প্রাকৃতিক বাতাস আর হাতপাখার উপরি নির্ভরশীল ছিলো। কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে শিশু-কিশোর-কিশোরীরা হাতপাখা নিয়ে এগিয়ে আসতো বাতাস করার জন্য। এতে মেহমানদের কদর বুঝা যেতো। এখন আর সেটা লক্ষ্য করা যায় না। শখের বা সুন্দর সুন্দর হাতপাখাও এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বৈদ্যুতিক ফ্যান ও রিচার্জেবল ফ্যানের উপরই এখন সবাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
তরুণ সংগঠক কেবি প্রদীপ বলেন, যদিও বৈদ্যুতিক ফ্যান বা রিচার্জেবল ফ্যানকে এখন আর এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই তবু আমাদের পূর্ব পুরুষদের একটি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হবে। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় এসবের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের লোকশিল্প বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
রবিবার দুপুরে শান্তিগঞ্জ উপজেলা পাগলা বাজারে কান্দিগাঁও কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের সামনে দেখা মিলে একজন হাতপাখা বিক্রেতার সাথে। তিনি নিজে হাতে পাখা তৈরি করে বিক্রি করেন বাজারে বাজারে। এই লোকশিল্পীর নাম মনির উদ্দিন। বাড়ি ময়মনসিংহের জামালপুরে। তিনি জানান, গরমের মৌসুমে এ ব্যবসা করি৷ সিলেটের কদমতলী এলাকায় থাকি। নিজে পাখা তৈরি করি। আমাদের আরো কারিগর আছে। প্রতিদিন ২শ’ বা আড়াইশো হাতপাখা নিয়ে বের হই। ৮০টি/ ১শ টি হাতপাখা বিক্রি করতে পারি। প্রতিটি হাতপাখা ৪০/৫০ টাকায় বিক্রি করি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার উজ্ জামান, লোকশিল্পের ব্যাপারে আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ আমাদের কাছে নেই। তবে মৃৎশিল্প, কুটির শিল্প, কামার-কুমোর ও লোকশিল্পকে রক্ষায় এডিবিসহ অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ বরাদ্দ করে এসব শিল্পের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই। গত বছরও প্রশিক্ষণ হয়েছে, এবছরও হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের সমাজসেবা থেকে কিছু অর্থ দিয়েও সহায়তা করা হয়। এবছরও হবে।

  • [১]