‘আমরা স্যারের উপর আস্থা ও বিশ^াস রেখে অনশন ভাঙছি। স্যার আমাদের আশ^স্ত করেছেন আমাদের দাবির বিষয়ে। কিন্তু উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, অনশন ভাঙার পর এভাবেই অনুভূক্তি ব্যক্ত করছিলেন জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের চলমান আন্দোলনে ২৮ অনশনকারীদের একজন। অপূর্বের এই কথা থেকে আন্দোলনকারী সকল শিক্ষার্থীর নাড়ির স্পন্দন বুঝা যায়। বিভিন্ন মহল যখন আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ঠিক তখন মঞ্চে আবির্ভূত হন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল নামের এই শ্রদ্ধা জাগানিয়া শিক্ষক। এই নামটি শাবি শিক্ষার্থীদের আবেগ ও অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। শিক্ষক জাফর ইকবাল সত্যিকার অর্থেই ছাত্র-শিক্ষক ভঙুর সম্পর্কের এই যুগে প্রকৃত শিক্ষকের আলোকবর্তিকা। সকল শিক্ষার্থীই তাঁকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখেন। তাই তিনি যখন অনশনকারীদের অনশন ভাঙানোর দায়িত্ব নিলেন তখন সকলেই বিশ^াস করা শুরু করেন যে, এবার কাজ হবে। টানা সাত দিনের অনশনে ২৮ অনশনকারীর জীবন ঝুঁকির দিকে চলে যাচ্ছিল। তাঁদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছিল। এরকম এক অবস্থায় পুরো দেশবাসী শিক্ষার্থীদের জীবন-ঝুঁকি নিয়ে সবিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি ভিসি’র পদত্যাগের বিষয়ে সরকারি কোন ঘোষণা না আসা এবং স্বয়ং ভিসি’র নির্বিকার মনোভাব সকলের চিন্তাকে দুশ্চিন্তায় পরিণত করেছিল। সকলেই ভাবছিলেন এই চরম উৎকণ্ঠার সময়ে এমন কেউ আসুন যিনি শিক্ষার্থীদের ধনুক-ভাঙা পণ ভাঙাতে পারেন। আর এই ব্যক্তি যে ড. জাফর ইকবাল ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না তা কে না জানে। তিনি আসলেন ভোর চারটায়। কথা বললেন আন্দোলনকারীদের সাথে। তাঁদের দাবি যাতে সরকার মেনে নেয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনশন ভাঙার আহ্বান জানালেন তিনি। তাঁকে কাছে পেয়ে আবেগে হাউমাউ করে কেঁদে আবেগের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। অবশেষে তাঁর অনুরোধেই বুধবার সকাল ১০ টার পর তাঁরা একযোগে অনশন ভাঙেন। একই সাথে ঘাম দিয়ে জ¦র ছাড়ার মত স্বস্তি লাভ করেন পুরো দেশের মানুষ।
ড. জাফর ইকবাল নিজ থেকে ক্যাম্পাসে এসেছেনÑ এরকম সরল ব্যাখ্যার কোন অবকাশ নেই। তিনি সরকারের উপর মহলের সাথে আলোচনা করে এসেছেন। তাঁর কথা থেকে এরকমই বুঝা যায়। শিক্ষার্থীরা অনমনীয় দৃঢ়তা, কঠোর শৃঙ্খলা ও সুসমন্বিত ব্যবস্থাপনার দ্বারা নিজেদের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করে এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আন্দোলনের এরকম অবস্থায় সাধারণত যৌক্তিক কোন দাবি অপূরণীয় থাকার কথা নয়। কিন্তু শাবি’র ক্ষেত্রে ড. জাফর ইকবালের প্রতিশ্রুতিতেই আস্থা স্থাপন করে তাঁরা অনশন প্রত্যাহার করেছেন। তবে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা তাঁদের শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে ড. জাফর ইকবালের প্রতি আস্থা রেখেছেন। এখন দায়িত্ব এই শিক্ষার্থী-বান্ধব প্রাক্তন শিক্ষকের। যদি তিনি শিক্ষার্থীথের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন অর্থাৎ সরকারকে দিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মানিয়ে নিতে পারেন তাহলে তাঁর ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। সামনের কয়েকদিনেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। আমরা আশাবাদী, অন্তত একজন স্বমহিমায় উজ্জ্বল শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের চোখে ছোট হতে দিবেন না সরকার। নতুবা এরকম সংকটে মধ্যস্ততা করার মত সর্বজনগ্রহণযোগ্য আর কেউ থাকবে না।
শাবি শিক্ষার্থীরা আমাদের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের চলমান অব্যবস্থাপনার রূপটি সকলের চোখের সামনে নিয়ে এসেছেন। মূলত এরকম অবস্থাই দেশের সকল পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে। শাবি’র মাধ্যমে উদঘাটিত হওয়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এইসব অব্যবস্থাপনা এবার দূরিভূত হোক আর শিক্ষাঙ্গন কেবল শিক্ষার আশ্রমই হয়ে উঠুক এই আমাদের কামনা।