বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লার চোরবস্তি নারকিলার (একাংশ) গৃহহীনদের ঘর পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। ঘর প্রদানে ধর্মপাশা উপজেলায়ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। শাল্লার নারকিলা গ্রামের ২ গৃহহীন পরিবার পরিবহনের টাকা খরচ করতে না পারায় তাদের ঘরের মালামাল এখনো পথেই আটকা আছে।
দিরাই- শাল্লায় ৫ টি পল্লী রয়েছে স্থানীয়ভাবে চোরের গ্রাম হিসাবে পরিচিত। গ্রামগুলো হচ্ছে শাল্লা উপজেলার খামারগাঁও, নারকিলা, উজানগাঁও, বল্লভপুর ও দিরাই উপজেলার জাহানপুর। এক সময় এই গ্রামগুলোর একাংশের বাসিন্দারা ভোটার তালিকায়ও পেশা চৌর্য্যবৃত্তি উল্লেখ করতেন। সরকারের খাস জমি দখল করেই বহুকাল আগে এখানে বসতি গড়েছিলেন একসময়ের চোরেরা। সম্প্রতি এসব পেশাদার চোরদের অনেকে আদি পেশা ছেড়েছেন সমাজের মূলধারায় যুক্ত হয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পূনর্বাসনের কিছু কাজ কয়েক বছর হয় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’ এই স্লোগানে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ৩০ টি ঘর পেয়েছেন এই গ্রামের গৃহহীনরা।
গ্রামের কবির মিয়া বললেন, ‘আমরা এখন চুরি ছারিদিসি ভাই, শেখ হাসিনায় আমরারে মায়া করছইন, তাইনরে যেন আল্লায় ভালা রাখইন, আমরা জানি শেখ হাসিনায় কইছইন ঘর পাইতে কেউ যেন এক টাকাও খরচ না করে, কিন্তু আমরার খরচ করা লাগছে।’
তিনি জানান, মালামাল আনতে গিয়ে পরিবহন খরচ প্রত্যেকের ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লেগেছে, কাঠ মেস্ত্রীকে ১৫০০ টাকা, ২০ কেজি রড ১৬০০ টাকা, দলিলের জন্য প্রথম ১৩ শ’ টাকা এবং শনিবারে দলিল আনার সময় আরও ১১৭০ টাকা দিতে হয়েছে।
কবির মিয়া বললেন, ‘আমার একটা গরু আছিল বেইচ্ছা এই টেকার ব্যবস্থা করছি।’
এই গ্রামের আলমগীর কবির, ইদু মিয়া ও ফিরোজ মিয়া একই কথা জানিয়ে বললেন, ‘ইউএনও সাবে আর এলাইছ মেম্বারের কাছে আমরা ১৫ জন গেছলাম। আমরা কইছলাম আমরা গরিব মানুষ প্রধানমন্ত্রী দয়া কইরা ঘর দিছইন আপনারাও একটু দয়া করঔকা। তারা ধমক দিয়া কইছইন টেকা না দিতে পারলে ঘর অন্যখানো দিলাইবা। আমরা পরে কষ্ট কইরা টেকার ব্যবস্থা করছি।’
ফিরোজ মিয়া জানালেন. ১০০০ টাকায় তিনমণ ধান দেবার শর্তে একজনের কাছ থেকে টাকা এনেছেন তিনি।
এরা জানালেন, দলিল আনতে যে ১১৭০ টাকা দেবার জন্য শাল্লায় বলা হয়েছে। এই টাকার ব্যবস্থা করতে পারেন নি বলে গ্রামের মঈনুদ্দিন, গণি মিয়া, আফাল উদ্দিন, কবির মিয়া এখনো দলিল আনতে যান নি।
দরিদ্র গৃহহীনরা বললেন, গ্রামের জজ মিয়া একেবারেই হতদরিদ্র তার ঘরের মালামাল এখনো নদীরপাড়ে আহসানপুরে পড়ে আছে। মালামাল আনতে যে পরিবহন খরচ লাগে সেটি ব্যবস্থা করতে না পারায় তার মালামাল ওখানেই পড়ে আছে। গ্রামের আলামিনের ঘরেরও কিছু মালামাল এখনো পরিবহন খরচের জন্য আনতে পারে নি।
গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, মালামাল আনা, রড, স্কু কেনা এবং কাঠমেস্ত্রীকে টাকা দেওয়াসহ ১৬ হাজারের মতো টাকা লাগছে তাদের। স্থানীয় ইউপি সদস্য এলাইছ মিয়া বলেছেন, টাকা খরচ করতে না পারলে ঘর অন্যদের দিয়ে দেবেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য এলাইছ মিয়াকে আশ্রয়হীনদের খরচের টাকা দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বললেন, এই জবাব উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিতে পারবেন।
এই গ্রামের গৃহনির্মাণ কাজ দেখভালকারী অফিসার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রহমানের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, পরিবহন বাবদ আমরা কোন টাকা নেই নি। মালামাল বাড়ির কাছে নদীরপাড়ে পৌঁছে দিয়ে বলা হয়েছে তারা যেন একটু কষ্ট করে নিজেরা নেন। কাঠ মেস্ত্রীর ৫০০০ টাকা আমরা দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে আমি ২ দিনের মধ্যে ফেরৎ দেব। পরিবহন খরচের টাকার জন্য বেশ কিছুদিন হলো জজ মিয়ার মালামাল নদীর পড়ে থাকার বিষয়টি সোমবারই আমি জেনেছি, কাল থেকে মালামাল আমরাই পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবো। আলামিনের ভিটেতে মাটি কাটা হচ্ছে, ওখানেও মালামাল পৌছে দেওয়া হবে। দলিলের জন্য কে বা কারা টাকা নিয়েছে আমি জানি না।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর আহমদ বললেন, শাল্লার প্রত্যন্ত এলাকায় ঘরের মালামাল পৌঁছাতে খরচ বেশি হচ্ছে। এজন্য বলা হয়েছে কষ্ট করে পারলে তারা নিজেরাই মালামাল নেবার জন্য। অন্য খরচের বিষয়ে তার জানা নেই বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা জানান, গৃহহীনদের জমির দলিল রেজিস্ট্রি’র টাকা তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের দিয়ে ব্যবস্থা করিয়েছেন। নামজারি ও খতিয়ানের জন্য ১১৫০ টাকা তিনি তার অফিস থেকে ব্যবস্থা করেছেন। আশ্রয়হীণদের কাছ থেকে কোন টাকা নেওয়া হয় নি বলে জানান তিনি।
এদিকে, ধর্মপাশায়ও অনেক এলাকায় আশ্রয়হীনদের দিতে হচ্ছে পরিবহন খরচ। এই উপজেলায় আশ্রয়হীণরাই নিজেদের ঘরের কাজে ব্যবহৃত বালু সরবরাহ করেছে। যারা উচ্চকণ্ঠ তারা বালুর টাকা পেয়েছে। নিরীহরা এখনো টাকা পায় নি।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মুনতাসির হাসান বললেন, গৃহহীনরা নিজেরা বালু সরবরাহ করলেও তাদের সকলেরই বালুর টাকা দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ৩০০ ঘরের মালামাল পৌঁছে গেছে। কোথাও কোন গৃহহীনকে পরিবহন খরচের টাকা দিতে হয় নি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে বলেছেন, কেউ চাইলেই প্রধানমন্ত্রীর মুজিবর্ষের বিশেষ উপহারে অনিয়ম করতে পারবেন না। কোথাও কেউ গৃহ নির্মাণের জন্য পরিবহন খরচের টাকা নিতে পারবেন না। নিলে অপরাধ হবে। তথ্য গোঁপন করে সামর্থবান কেউ ঘর পেলে তার ঘর ফেরৎ নেওয়া হবে।
‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’ এমন স্লোগান হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে জনপ্রিয় এখন। জেলার ১১ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার ৩৯০৮ দরিদ্র পরিবার প্রধানমন্ত্রীর এই উপহার পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে ৪০৭ টি আশ্রয়হীন পরিবারের ঘরের কাজ শেষ হয়েছে গত ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দরিদ্র-আশ্রয়হীন এই ৪০৭ পরিবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরের চাবি ও দলিল সমঝে দিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিভিআরপি প্রকল্পের আওতায় জেলার ১১ উপজেলার স্ব স্ব উপজেলা প্রশাসন প্রায় ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘরগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। এক লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে ২ শতক জমিতে দুটি শুবারঘর, একটি রান্নাঘর, একটি বাথরুম এবং প্রতিঘরেই ছোট বারান্দা রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই নতুন ঘরগুলো অনেক গ্রামকে ইতিমধ্যে আলোকিত করেছে। প্রত্যেকটি ঘরে পল্লী বিদ্যুৎ বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ লাইন থেকে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বিদ্যুৎ দিতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।