বিশেষ প্রতিনিধি
অধ্যক্ষকে মারপিটের ঘটনায় দোয়ারাবাজারে উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলা স্কুল-কলেজ শিক্ষক সমিতি এই ঘটনার প্রতিবাদে সভা করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসির সঙ্গে দেখা করে ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। বুধবার ঘটনার প্রতিবাদে উপজেলা সদরে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। এদিকে এলাকাবাসীসহ বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড়খাল স্কুল এ- কলেজের নামকরণ নিয়ে দ্বন্দ্বে মারপিটের শিকার হয়েছেন অধ্যক্ষ। পুলিশ এই ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
দোয়ারাবাজারের সবচেয়ে বড় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বড়খাল স্কুল এ- কলেজ। ১৯৭০ সালে এই বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে এর ছাত্র সংখ্যা এক হাজার সাতশ’ প্রায়।
স্থানীয় একাধিক শিক্ষার্থী অভিভাবক জানান, বড়খাল স্কুল এ- কলেজের নামকরণ নিয়ে গত প্রায় পাঁচ ধরে প্রভাবশালী ভূমিদাতা পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ- পরিচালনা কমিটির বিরোধ চলে আসছে। এর জের ধরেই রবিবার অধ্যক্ষকে পিটিয়েছে ভূমিদাতা পরিবারের লোকজন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশের গ্রাম ঘিলাতলির বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বললেন, বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগের পর থেকেই ভূমিদাতা পরিবারের সদস্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধে দুইপক্ষেই কিছু শিক্ষকও জড়িয়েছেন। সোমবার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সময় টেবিল আনার জন্য কয়েকজনকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠান ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন। টেবিল দেওয়া নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে চেয়ারম্যানের লোকজনের কথা কাটাকাটি হয়। ওই সময় তারা চেয়ারম্যানকে শাসিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই এমন ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান আবুল হোসেন বললেন, স্কুলের নামকরণের জন্য ভূমিদাতার ছেলে হিসাবে আমি আদালতে মামলা করি। মামলায় হাজী মফিজ আলী স্কুল এ- কলেজ নামকরণের পক্ষে রায় দেন। আদালতের রায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর সিলেট শিক্ষা বোর্ড ও বড়খাল বহুমুখী স্কুল এ- কলেজের অধ্যক্ষকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দেবার জন্য চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু অধ্যক্ষ দুই বছর হয় এই প্রতিবেদন পাঠান নি। তার সঙ্গে একাধিকবার আমরা পারিবারিকভাবে বৈঠক করেছি, তিনি আমাদের সহযোগিতা করেন নি। রবিবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ কাজের প্রয়োজনে তার ওখানে (অধ্যক্ষের কাছে) টেবিল আনার জন্য পাঠালে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। স্কুলের অফিস সহায়ক আবু হানিফ টেবিল দেবার কথা বললে, তিনি (অধ্যক্ষ) তাকেও ধমক দেন। আমাদের পরিবারকে নিয়েও কটাক্ষ করেন। এরপর আমার দুই ভাতিজা অধ্যক্ষের কাছে যায়। ওখানে অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আমার ভাতিজাকে অধ্যক্ষ চর-থাপ্পরও দেন। শেষে শুনেছি তারাও অধ্যক্ষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধ্যক্ষ নজীর আহমদ মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বললেন,‘ঘটনার হোতা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন। প্রশাসন চাপ দেবার পর সকলের কাছে ভালো সাজতে আমার উপর হামলাকারী ভাতিজাদের পুলিশে দিয়েছেন তিনি। এর আগে কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমাকে মেরে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন। আমি তার ভাতিজাকে চর থাপ্পর দিলে সিসি ক্যামেরায় সেটি থাকবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেটি দেখতে পারেন মন্তব্য করে অধ্যক্ষ বললেন, আমি সিসি ক্যামেরার আওতা থেকে সরতেই তারা আমার উপর হামলা করেছে। নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নামকরণের চিঠিতে ভূমিদাতা হিসাবে আবুল হোসেনের নামোল্লেখ থাকায় আমি আইনের ব্যত্যয় না ঘটাতে ভূমি দাতার নাম সংশোধন করার জন্য বলেছি। আমার প্রতিষ্ঠানের কোথাও আবুল হোসেন ভূমি দান করেছেন এমন কাগজ পাই নি।
বড়খাল স্কুল এ- কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বললেন, বিদ্যালয়ের নাম বড়খাল স্কুল এ- কলেজের পরিবর্তে হাজী মফিজ আলী স্কুল এ- কলেজ করার জন্য এফিডেভিট করে চার বছর আগে আমি ও অধ্যক্ষ স্বাক্ষর করে আদালতে দিয়েছি। নামকরণের বিষয়টি ইতিপূর্বে সুরাহা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে ভূমিদাতা আবুল হোসেন উল্লেখ আছে। এটি সংশোধন করার জন্য বলা হয়েছে। এরমধ্যে ছেলেদের দিয়ে এরকম ঘটনা ঘটানোয় এলাকাবাসী বিব্রত হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক হয়েছে।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি দেবদুলাল ধর জানিয়েছেন, অধ্যক্ষকে মারধরের ঘটনায় চারজনকে আসামী করে রবিবার রাতেই মামলা হয়েছে। এরমধ্যে দেলোয়ার হোসেন ও মুখলেছুর রহমান নামের দুই আসামীকে গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে সোমবার আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
কোর্ট ইন্সপেক্টর বোরহান উদ্দিন জানালেন, দোয়ারাবাজারে কলেজ অধ্যক্ষকে মারপিঠের ঘটনায় দুইজনকে পুলিশ আদালতে সোপর্দ করেছে। তাদের পক্ষে কেউ জামিনের আবেদন না করায় দুইজনকেই জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।