মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের ১৫টি সুপারিশ আসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত দুই দিনের শিক্ষাবিদদের কর্মশালায়। শিক্ষামন্ত্রীসহ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা ওই কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালার অন্যতম একটি সুপারিশ যা ২০১৯ সন থেকে বাস্তবায়ন করা হবে সেটি হলো, দেশের সবগুলো বোর্ড অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করবে। সারা দেশে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই যেহেতু এক সেহেতু অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ করা হলে মেধার সুষম মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া এসএসসি পর্যায়ে মূল পরীক্ষায় শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খেলাধূলা, চারু ও কারুকলা এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা নামক বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে পরীক্ষার্থীদের উপর থেকে চাপ কমানোর সুপারিশও বাস্তবায়ন করা হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইগুলোকে আরও সুখপাঠ্য ও আকর্ষণীয় করে তৈরি করার জন্য একটি অভিজ্ঞ কমিটিকে দায়িত্ব দেয়া হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপকভাবে বই পড়ায় আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষাবিদদের কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশমালার যেগুলো শিক্ষাসহায়করূপে বিবেচিত হবে সেগুলো প্রযুক্তকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সহায়ক একটি শিক্ষা পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
আমাদের দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা একধরনের পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষা-নীরিক্ষার ভার আর সহ্য করতে পারছে না। তাদেরকে গিনিপিগ বানানোর জায়গা থেকে মুক্তি দেয়া উচিৎ। আমরা কিছুতেই বুঝতে পারি না কেন আমাদের শিক্ষাবিদরা একটি স্থায়ী শিক্ষা দান পদ্ধতির উদ্ভব করতে পারছেন না। সারা বিশ্বেই তো দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর বিবেচনা করে একটি স্থায়ী কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। আমরা পারছি না কেন? সম্ভবত আমাদের দেশের মতো এত বহুমুখী শিক্ষা কার্যক্রম আর কোন দেশে চালু নেই। একই দেশে মাদ্রাসা, বাংলা মিডিয়াম, ইংরেজি মিডিয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন পাঠক্রম অনুসরণ করে সমমানের সনদপত্র লাভ করা যায়। বিষয়টি একেবারেই হাস্যকর। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ন্যূনতম মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একমুখী না করা পর্যন্ত এ ধরনের পরীক্ষা-নীরিক্ষার সুফল কম পাওয়া যাবে বলেই আমাদের সিিমত জ্ঞানে মনে হচ্ছে। আর শিক্ষার সংস্কার প্রশ্নে কোন সিদ্ধান্তই তো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এই সরকারের আমলে প্রণীত শিক্ষানীতি যেমন বাস্তবায়ন করা যায়নি তেমনি গতবছর সিদ্ধান্ত নেয়া পিএসসি নামক যন্ত্রণা থেকেও শিশুদের রেহাই দেয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রচলিত সৃজনশীল পাঠপদ্ধতি ও প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে মেধার সঠিক ও যথাযথ বিকাশ ঘটছে না, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মতামতে সেটি প্রমাণিত। বিশেষ করে ইংরেজি ও বাংলা ভাষা শিক্ষায় গ্রামার ও ব্যাকরণ শিক্ষাকে ভজকট অবস্থায় ফেলে দেয়ায় শিক্ষার্থীদের ভাষাজ্ঞানের ভিত দুর্বল থাকছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিশ্চিত করা একেবারেই সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষা হয়ে পড়েছে উচ্চমূল্যের পণ্য। শিক্ষাকে এভাবে গরিবদের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়ে কোন্ লক্ষ্য অর্জিত হবে সেটি বের করার মতো মগজ আমাদের এখনও হয়নি।
শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর জন্য অবশ্যই আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের বীজ বপণ করার যেকোন উপকরণকে নিষিদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের সকল শিক্ষার্থীকে অভিন্ন পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে সনদ অর্জন করতে হবে। পাঠক্রম তৈরি করতে হবে বিজ্ঞান, যুক্তি ও দেশকে কেন্দ্রে রেখে। এইসব মৌলিক নীতি আমাদের শিক্ষানীতিতে রয়েছে। ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। আমরা আশা করব শিক্ষা নিয়ে যাবতীয় নীরিক্ষার ইতি ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের রাস্তায় হাঁটতে এবার অন্তত আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।