পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের দাবি করেছে বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। মূলত তাদের এই দাবি নতুন নয়। এই দাবিতে তারা নিরন্তর কাজ করে চলেছে। এই দাবির সাথে তাদের আরেকটি দাবি উঠে এসেছে। সেটি হল- বৈষম্যহীন শিক্ষা চাই। শিক্ষার জাতীয়করণের সাথে বৈষম্যমুক্ত শিক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্ত্রী উপলক্ষে সংগঠনটির সুনামগঞ্জ জেলা শাখা বুধবার শহরের শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে যে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলেন সেখানে তাদের এই দাবির সাথে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান আরও কিছু সংকট ও সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আলোচকদের কথার সারাংশ একটাই, সেটি হল- বাংলাদেশে এখন যেভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে সেখানে পরিকল্পনা, সদিচ্ছা, উদ্দেশ্য ইত্যাদির কোন সংযোগ নেই। চালকহীন গাড়ির মত ঝুঁকি নিয়ে চলছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। আলোচকরা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ল্যাব নাম দিয়ে প্রচুর কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। এইসব ল্যাবে কম্পিউটার আছে। কিন্তু সেগুলোর কোন ব্যবহার নেই। কারণ কম্পিউটার শিখানোর মত কোন শিক্ষক নেই অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আলোচনায় উঠে এসেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন প্রচুর দালানকোঠা নির্মাণ করা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। কলেজগুলোতে যথেচ্ছভাবে অনার্স-মাস্টার কোর্স চালু হচ্ছে কিন্তু দেয়া হচ্ছে না শিক্ষক। ফলে শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তি হচ্ছেন বটে কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। পঠনপাঠন ছ্ড়াাই শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে। দেশে শিক্ষিত লোকদের কর্মসংস্থানের যে প্রচণ্ড অভাব তার পক্ষে প্রমাণ হিসাবে বলা হয়েছে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনে নিযুক্তি পাওয়া ৮ম শ্রেণির যোগ্যতাসম্পন্ন অফিস সহায়ক পদের বেশির ভাগই ডিগ্রি বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের দ্বারা পূরণ হওয়া। অন্যদিকে যেসব জায়গায় বিশেষভাবে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন সেসব জায়গায় উপযুক্ত কর্মীর অভাবে বিদেশ থেকে দক্ষ লোক আনতে হচ্ছে। অর্থাৎ দেশে একদিকে শিক্ষার নামে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে কিন্তু সেখান থেকে উপযুক্ত জনবল বের করে আনা যাচ্ছে না।
স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই হতাশাজনক চিত্র দেখে নাগরিক মাত্রই হতাশায় আক্রান্ত হন। এই অবস্থাটি তৈরি হয়েছে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী শিক্ষা পরিকল্পনার অভাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে আসলে আমরা কী করতে চাই তা পরিস্কার নয় কারও কাছে। আমরা যেভাবে সর্বত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে অধিক আগ্রহ বোধ করি সেভাবে ওইসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার মত উপযুক্ত শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারছি না এর আগের স্তরগুলোতে। মূলত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আমরা শিক্ষার্থীদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে একজন এমএ পাস শিক্ষার্থীকে দেখে বুঝার উপায় থাকে না তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রিসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। অন্যদিকে আমরা সার্বজনিন শিক্ষা লাভের যে ন্যূনতম ধাপ সেখানেও অনেক পিছিয়ে রয়েছি। সাকুল্যে আমাদের স্বাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশের উপরে নয়। এই লক্ষ্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়ে নতুন করে লক্ষ ঠিক করার কাজটি করতে না পারলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ^ব্যবস্থায় আমাদের মুখ লুকিয়েই থাকতে হবে।
বাকবিশিস শিক্ষার জাতীয়করণ ও বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার যে দাবি তুলেছে তার মর্মার্থ একটাই। আমরা শিক্ষাকে বৈশি^ক স্তরে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য শিক্ষাক্ষেত্রে পরিকল্পিত উপায়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকল সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এবং অবশ্যই শিক্ষার মূল কারিগর শিক্ষকদের সম্মানজনক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ক্রয়যজ্ঞের মহোৎসবের মাধ্যমে এ উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। এজন্য চাই যেমন একটি উপযুক্ত দর্শন তেমনি চাই স্বচ্ছতার সাথে ওই দর্শন বাস্তবায়নের আন্তরিক কর্মযজ্ঞ।