সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর এক কঠিন সংকল্প করেছেন রাজধানীর শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অন্যতম একটি দাবি হাফ ভাড়া বিষয়ে সরকার কিছুটা সাড়া দিয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় রাত ৮ টা পর্যন্ত হাফ ভাড়া গ্রহণের বিষয়ে সরকার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সরকারের এই ঘোষণায় তেমন সন্তুষ্ট নন। তারা পুরো দেশে সকল সময়ের জন্য শিক্ষার্থীদের হাফভাড়া দাবি করেছেন। এছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোপূর্বে তাদের দেয়া ১১ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছেন। গতকাল তারা সড়কে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লালকার্ড প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করেছেন। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সনে এসব দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন। তাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে সরকার দাবি মানার ঘোষণা দিলে তারা আন্দোলন স্থগিত করেন। কিন্তু এর মধ্যে ৩ বছর চলে গেলেও দৃশ্যত সড়কে শৃঙ্খলা ফেরা, দুৃর্ঘটনা হ্রাস কিংবা হাফ ভাড়া; কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। এর মাঝেই নটরডেম কলেজের এক ছাত্রের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সনের ওই সড়ক আন্দোলনকে শিক্ষার্থীরা আবার পুনরুজ্জীবিত করেছেন। এবার শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ের ব্যাপারে ঠিক কতখানি সফলতা অর্জন করবেন তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সাধারণ মানুষের সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। কোনো মহল থেকেই তাদের দাবির বিপক্ষে কোনো যুক্তি তোলে ধরা হচ্ছে না। তবুও সংগঠিত ও ক্ষমতাশালী সড়ক-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এই স্বতস্ফূর্ত জাগরণ হয়তো চূড়ান্ত পরিণতি পাবে না। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভিতর যে প্রচুর অসংলগ্নতা রয়েছে, রাষ্ট্র যে সড়ককে কিছু মানুষের ব্যবসা করার জন্য অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে; সেটি সকলের সামনে আবারও উন্মোচিত হলো।
আমাদের চারপাশে কতো সমস্যা, কতো দুর্নীতি, কতো বেআইনি কর্মকা-। সকল অনিয়ম ও দুর্নীতিকে মেনে নেয়ার এক অদ্ভুত মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে আমাদের। ফলে প্রতিদিনই সাধারণের অধিকারহরণ আর সবল-সংগঠিতদের অন্যায় আবদার পূরণের দৃশ্য দেখি আমরা। সড়কে যে কত ধরণের অনিয়ম, দুর্নীতি রয়েছে শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এর প্রতিকার কই? এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কেউ নেই। কত দাবি নিয়ে দেশের ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলো কণ্ঠ সরব করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কিংবা জ¦ালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও এর প্রতিক্রিয়ায় যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি, সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মৃত্যু, সড়কে অযোগ্য যানবাহনের ভিড়, সামাজিক অপরাপর জায়গায় এত এত অনিয়ম; কোনো কিছু নিয়েই আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলো কখনও সরব হয় না। কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তাদের যত আন্দোলন। এমন নিস্পৃহ সময়ে দেশের শিক্ষার্থীরা অন্তত সড়কে অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছেন, অসংগঠিত জনতা তাই তাদের বিপুলভাবে অভিনন্দিত করছেন। অসহায় মনের অব্যক্ত বেদনার কথা তারা যেন শৃুনতে পেয়েছেন এই শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে। এই মুহূর্তে তাই শিক্ষার্থীরাই যেন হয়ে উঠেছেন দেশের তাবৎ সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি।
সরকারের প্রতি আমাদের নিবেদন থাকবে, শিক্ষার্থীদের প্রতি কঠোরতা নয়, বরং সংবেদনশীলতা নিয়ে তাদের দাবি বিবেচনা করুন। তাদের প্রতিপক্ষ নয়, মানুষের কণ্ঠস্বর বিবেচনা করুন। অসিহষ্ণুতা নয় সহিষ্ণুতা নিয়ে অনুভব করুন কেন তারা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। এই শিক্ষার্থীরা আমাদেরই সন্তান। শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ রাখেন না। তারা নিজেদের এক সতীর্থের মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে একটি বড় সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠা কাঠামোগত অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের এই জনপ্রিয় অবস্থানকে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জায়গা থেকে মূল্যায়ন করুন।