মনোরঞ্জন তালুকদার
গত ২২/০৯/২০২২ খ্রিঃ রোজ বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা পরিষদের মিলনায়তনে জগন্নাথপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার গুণগত মান এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সকল অংশীজনদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। প্রসঙ্গত এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যদিও ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে ছাত্র/ছাত্রীদের পাশের হার বিবেচনায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। পাশের হার ছিল ৯৭.০৪% এবং সার্বিক ফলাফল বিবেচনায় দশম স্থান অর্জন করে (জিপিএ এর ভিত্তিতে), তারপরও সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করার জন্য ইউএনও মহোদয়ের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তিনি আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করেছেন সর্বস্তরের অংশীজনের অংশগ্রহণর মাধ্যমে একটি কার্যকর, সফল লক্ষ্যে পৌঁছানোর। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে অধিকাংশের অংশগ্রহণ যেমন নিশ্চিত করা যায়নি তেমনি যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মতামতের মধ্যেও কোন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা ছিল না- ব্যতিক্রম দুতিন জন ছাড়া। তাই এই বিষয়টি নিয়ে লিখার ইচ্ছে ছিল না। কারণ আমি ব্যক্তিগত ভাবে অধিকাংশ বক্তার বক্তব্য শুনে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষত একজন কর্মকর্তার বক্তব্য এতটাই হতাশাজনক ছিল যে, আমার মনে হয়েছে শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়ে উনার চিন্তাভাবনা শুধু পশ্চাৎপদ নয় অনেকটা এলোমেলো। আজকের ভার্চুয়াল জগতের ছাত্র/ছাত্রীদের মানসিক ভাবনায় যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে সম্ভবত তিনি সেটাও উপলব্ধি করতে পারেন না। ৪০ বছর আগের ছাত্র/ছাত্রী মানস জগতের ভাবনা আর আজকের ছাত্র/ছাত্রীদের মানসিকতার মধ্যে যে বিপুল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এটা উপলব্ধি করতে না পারা যেমন দুঃখজনক, তেমনি ঢাকা কলেজের ছাত্র/ শিক্ষকদের সাথে বিশেষত আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের মত ব্যতিক্রমী শিক্ষকের সাথে জগন্নাথপুর সরকারি কলেজের ছাত্র/শিক্ষকের তুলনামূলক আলোচনাকে কি ভাষায় মূল্যায়ন করা যায় তা আমার জানা নেই। তবে আমি এটা জানি ব্যতিক্রম কোন নিয়ম নয়। ব্যতিক্রম নিয়ে আলোচনা হতে পারে কাউকে অনুপ্রাণিত করার উদাহরণ হিসেবে সমস্যা সমাধানের উপকরণ হিসাবে নয়। স্থান-কাল-প্রেক্ষিত বিচার করে মন্তব্য করার বোধ যার বা যাদের নেই তাদের উদ্দেশ্য একটাই বুঝে না বুঝে সুযোগ পেলেই আক্রমনাত্মক কথা বল অন্যকে অপমানিত করার চেষ্টা করা।
যাহোক মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য দু’একটি কথা বলতে চাই।
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্বেও যেমন, শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো (যদিও এখনো শিক্ষক ঘাটতি ব্যাপক), শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, প্রতিটি শিক্ষা পপ্রতষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা, শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভাবে অবকাঠামোর উন্নয়ন করা সত্বেও শিক্ষার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছায় বৃহত্তর পরিসরে অভিভাবক, সমাজ, শিক্ষার নীতিনির্ধারক সহ সবার মধ্যেই একটা উদ্ববেগের বিষয় হচ্ছে মান-সম্পন্ন শিক্ষার দৃশ্যমান উন্নতি দেখতে না পাওয়া।
সম্প্রতি বুয়েটের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. জসিমউদ্দীন জামান The daily star পত্রিকায় মান-সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে করণীয় সম্পর্কে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেন। যার টাইটেল ছিল AN INNOVATIVE WAY TO ACHIEVE QUALITY EDUCATION IN BANGLADESH.
তার বক্তব্যের মূল কথা হচ্ছে, আমাদের প্রথমেই উচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। যে কথাটি সেদিনের মত বিনিময় সভায় গরীবের ডাক্তার হিসাবে পরিচিত ডাক্তার মধূসুধন ধরও বলেছিলেন এবং যিনি নিজে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এর মাধ্যমে জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে বদলে দিয়েছেন। এবং আমার ধারণা এই ভাবনা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ও এমন একটি মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তাছাড়া বাংলাদেশে মান সম্পন্ন শিক্ষার উপর চমৎকার একুটি বই প্রকাশিত হয়েছে যার লেখক JOHN RICHARDS, MANZOOR AHMED, AND SHAHIDUL ISLAM. বইটির নাম হচ্ছে THE POLITICAL ECONOMY OF EDUCATION IN SOUTH ASIA.
বইটির লেখক ত্রয় অত্যন্ত দক্ষতার সহিত মান সম্পন্ন শিক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রধান প্রতিবন্ধকতা সমূহ হচ্ছে, দারিদ্র, অসমতা এবং বিছিন্নতা (Poverty, inequality, and exclusion) এছাড়া আরো কিছু কারণের কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন সম্ভব হলে সেগুলো পরে উল্লেখ করবো।
তাছাড়া MUSTAFIZUR RAHMAN এর বই Reform DEVELOPMENT THINKING বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে শিক্ষার উপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। শিক্ষার মান উন্নয়নের আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ বইটি পড়ে দেখতে পারেন। তাহলে সমস্যার গলদটা সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন।
আমার উপরোক্ত আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই আর তাহলো মান সম্পন্ন শিক্ষার সমস্যাটা শুধু জগন্নাথপুরের নয়। এটা সারা দেশের সমস্যা কিংবা আরো বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যাও বটে। তবে এই সমস্যার হয়তো মাত্রাগত তারতম্য আছে, আছে স্থানীয় প্রেক্ষাপটও। তাই হয়ত স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান জগন্নাথপুর সরকারি কলেজের সমস্যা সমূহ স্থানীয় ভাবে কতটা সমাধান করা যায় তারই অংশ হিসাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এই মহতী উদ্যোগ।
আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি জনাব সাজেদুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জগন্নাথপুর। আমার সুদীর্ঘ ত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে আগে কখনো কোন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এতটা আন্তরিকতাপূর্ণ মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে দেখিনি। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ কলেজের উন্নয়নে নানা রকম ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি না হয়েও শিক্ষা ও পরিবেশের মান উন্নয়নের ব্যাপারে ছাত্র, শিক্ষক ও অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এত বৃহত্তর পরিসরে এমন উদ্যোগ আগে কাউকে নিতে দেখিনি। যতদূর শুনেছি জগন্নাথপুর কলেজের সাথে কোন না কোন ভাবে যারা জড়িত ছিলেন তাদের অনেককেই তিনি ব্যক্তিগত ভাবে টেলিফোন করে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এ থেকেই বুঝা যায় তিনি কত আন্তরিকতার সহিত উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। সেজন্য আবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব সাজেদুল ইসলাম সাহেবকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সাথে সাথে এই বেদনা বোধের কথাটাও উল্লেখ করতে চাই যে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা সত্বেও অংশীজনের উপস্থিতি শুধু শিক্ষকবৃন্দ ছাড়া আর কারো ছিল না বললেই চলে। ছাত্র/ছাত্রীদের অনেক চেষ্টার ফলে উপস্থিত করা সম্ভব হলেও মত বিনিময় সভা শুরু হবার পূর্বেই তারা চলে যায়।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যেখান সমাজের সচেতন মহল, শিক্ষানুরাগী ও সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও একধরনের উদ্বেগ, উৎকন্ঠা দেখা যায় সেখানে ছাত্র, অভিভাবক সহ স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এক ধরনের উদাসীনতা বিদ্যমান যা অত্যান্ত বেদনাদায়ক। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে জগন্নাথপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও পরিবেশের উপর। যে কোন কিছুর উন্নয়ন করতে হলে উন্নয়ের প্রতিবন্ধকতা সমূহকে চিহ্নিত করতে, প্রতিবন্ধকতা সমূহ দূরীকরণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর আন্তরিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে এবং অবশ্যই তা চলমান রাখতে হবে। কারন যে কোন প্রকার উন্নয়ন হচ্ছে একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম। সাথে সাথে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে সমস্ত ক্ষেত্রের প্রতিবন্ধকতা সমূহ একই প্রকৃতির এবং একই মাত্রার নয় তাই সমাধানেরও কোন একক পদ্ধতি দিয়ে তার সুফল পাওয়া যাবে না। স্থান ও সময়ের প্রেক্ষিত এক্ষেত্রে একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। শিক্ষার মান উন্নয়ন কোন একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে অর্জনের আশা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন অনেক উপাদানের সমন্বিত, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও কর্মকান্ড। শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিত করার জন্য যে সব উপাদান ও উপকরণ একান্ত প্রয়োজন তা হলো আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, ভৌত অবকাঠামো, যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি, নির্ভুল পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতি, ধারাবাহিক পরিবীক্ষন পদ্ধতি এবং সর্বোপরি কমিউনিটি এনগেজমেন্ট নিশ্চিত করা।
এ সবই হচ্ছে প্রয়োজনীয় কিন্তু তাত্ত্বিক কথা। আমরা ওদিকে না গিয়ে জগন্নাথপুর সরকারি কলেজে শিক্ষা ও পরিবেশের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে কি কি সমস্যা আছে যদি তা নির্মোহ ভাবে চিহ্নিত করতে পারি তাহলে সমাধানের একটি পথও সবার সার্বিক সহযোগিতায় বের করা সম্ভব হবে।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি জগন্নাথপুর সরকারি কলেজের সমস্যা সমূহ নিম্নরূপ-
১. পরিচালনাগত সমস্যা
২. বহিরাগতদের দৌরাত্ম
৩. ছাত্র/ছাত্রীর ব্যাপক অনুপস্থিতি
৪. শিক্ষক/কর্মচারীর স্বল্পতা
৫. মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদের সিলেট ও ঢাকায় চলে যাওয়া।
উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাধানে যদি প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, অভিভাবকবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ধারাবাহিকভাবে আন্তরিক চেষ্টা করেন তবে খুব দ্রুতই সমস্যাগুলোর সমাধান হবে এবং সুন্দর একটি পরিবেশে শিক্ষাদান কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালিত হবে।
পরিচালনা গত সমস্যা বলতে আমি বুঝাতে চেয়েছি কলেজে পঠন, পাঠনের ক্ষেত্রে যে সমস্যা আছে তা দূরীকরণ। পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিতকরণ, ক্লাসরুমে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, সাউন্ড সিস্টেম ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নিশ্চিত করা, ছাত্র/ছাত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ছাত্র/ছাত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রাপ্য সুবিধা সমূহ নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
দ্বিতীয়তঃ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় যে কোন ভাবেই হোক বহিরাগতদের দৌরাত্ম বন্ধ করা। বহিরাগতদের দৌরাত্ম বন্ধ করা না গেলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ কোন ভাবেই নিশ্চিত করা যাবেনা।
তৃতীয়তঃ ছাত্র/ছাত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকের অত্যান্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে যাতে প্রতিটি অভিভাবক জানতে পারেন তার সন্তান কলেজে উপস্থিত ছিল কিনা।
চতুর্থতঃ অন্ততঃ শিক্ষক স্বল্পতা কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এর মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তাছাড়া ছাত্র/ছাত্রীদের একটা অভিযোগ দেবার জায়গা তৈরি করতে হবে যেখান থেকে সে তার অভিযোগের সমাধান পাবে।
সর্বোপরি কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করে কলেজের পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জটিলতা দূর করতে হবে।
যদি জগন্নাথপুরের শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সচেতন মহল এবং প্রশাসন নির্মোহ দৃষ্টিতে কলেজের শিক্ষার পরিবেশের মান উন্নয়নের বিষয় কার্যকর ভাবে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেন তবে সাফল্য আসবেই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ।