- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শিক্ষায় শ্রেণি বৈষম্য প্রসঙ্গে

আসাদ মনি
শিক্ষা আমাদের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব বহন করে। এইজন্যই বলা হয় শিক্ষা জাতির মেরুদ-। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ভেতরকার সত্তা জাগ্রত হয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে সমাজ ও সভ্যতা ক্রমবিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মানুষ এবং সমাজের যে দর্শন তা বুঝতে শিক্ষা প্রয়োজন। লেনিন তার হোয়াট এবাউট আওয়ার মিনিস্টার থিং এ লিখেছেন, মিনিস্টার খুব ভাল করেই জানেন, শ্রমজীবী মানুষ হচ্ছেন একটা বারুদের স্থুপ আর শিক্ষা হচ্ছে  আগুনের স্ফুলিঙ্গ।  বারুদের স্থুপের উপর আগুনের স্ফুলিঙ্গ পড়লে যে বিস্ফোরণ হবে তাতে তাদের ক্ষমতার গদিটাই উড়ে যাবে। সমাজের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক তা একে অপরের পরিপূরক। যেমন আমরা চোখে যা দেখি, তা কি সবসময় ঠিক? কোপারনিকাস বলেছেন, আমি যখন ঘোড়ার গাড়িতে যাচ্ছিলাম, দেখলাম গাছগুলো আমার পিছনে চলে যাচ্ছে, এখন গাছ কী সত্যি পেছনে যাচ্ছিল? বস্তুর এই ভেতরকার কারণগুলো বের করার জন্যই আবিষ্কার হয়েছে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। সমাজ সভ্যতার সুষ্ঠু বিকাশে যে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন তাই সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের দু’টুকে দ্বান্দ্বিক সমন্বয় করে যা তাকে বলে দর্শন। প্রবাদবাক্য আছে, সাবধানে করিও কাজ করিয়া ভাবিওনা, এখানে দর্শনের চিন্তা কী?- কাজ করার আগে ভাবা। অথবা সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গ সর্বনাশ, এই প্রবাদ বাক্যের দর্শনটা কী? Ñ ভালো বন্ধু নির্বাচন করা। জীবনের প্রত্যেক দিনের কর্মকা- কোনো না কোনো ভাবে দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত। একটি রাষ্ট্রের বাসকৃত জনগণকে গড়ে তুলে সঠিক দর্শন শিক্ষার মাধ্যমে। বাজারে আলো এবং পেঁয়াজের দাম এত পার্থক্য কেনো? একই মাটিতে আলো এবং পেঁয়াজের চাষ হওয়া সত্বেও দু’টুর বাজারে আর্থিক মূল্য এত ভিন্ন কেনো? দু’টুর ভিন্নতা বুঝার জন্য যে দর্শন শিক্ষার প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা কী আমাদের সিলেবাসে আছে? অথবা সেই নীতি-নৈতিকতা শেখানো হয়?  রাশিয়ায় (সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ছিলো) মার্কিন সাংবাদিক  স্কুল পরিদর্শন করতে গিয়ে বাচ্চাদের প্রশ্ন করলেন, বল তো আমি যদি ২০ রুবল দিয়ে ১ কেজি আপেল কিনে ৩০ রুবলে বিক্রি করি, তাহলে কত লাভ হবে? কেউ কিছু বলছে না। তখন সাংবাদিক বললেন, কী ব্যাপার এই সামান্য অংক আপনারা শিখান নাই? হঠাৎ করে একজন ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, কেনো আমি ২০ রুবল দিয়ে কিনে ৩০ রুবলে বিক্রি করবো? মার্কিন সাংবাদিক নিজে ধোলাই হয়ে আসলেন। এখন আমাদের বাচ্চাদের কী শিখানো হয়?  ৫০ টাকা দিয়ে ১ লিটার দুধ কিনে, কত কতটুকু পানি মেশানো হলে ৬০ টাকা লাভ হয়। আর না’ই বললাম,  আমাদের শিক্ষায় যেটুকুই আছে সেটুকুই প্রয়োগ আছে কী? না, তার লেস মাত্র নেই। ছোট বেলায় মুরব্বিদের বলতে শুনতাম, “পড়াশুনা করে যে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে”, এখন বড় হয়ে দেখি রাষ্ট্রব্যবস্থা তার উল্টো চলে। “গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে যে, পড়াশুনা করে সে” অথাৎ টাকা যার শিক্ষা তার এই নীতিতে দেশ চলছে। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রেমিক- প্রেমিকার, পিতা-পুত্রের, বাবা-মা’র সব সম্পর্কই পণ্যে পরিণত করেছে। শিক্ষাও পণ্য। কিন্তু এটাই কী কথা ছিলো? ৭১- এ বিপ্লব তো হয়েছে আমাদের দেশে। সেই বিপ্লব বা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সাধারণ মানুষের আকাঙ্খার বাস্তবায়ন ও শ্রেণিবৈষম্য শেষ করে একটি মানবিক রাষ্ট্র বির্নিমাণ করাই ছিলো শোষিত শ্রেণির সংকল্প। বাষট্টির মহান শিক্ষা আন্দোলন করেছি আমরা। ছাত্র জনতার ঐক্য স্থাপন করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা নীতি বাতিল করেছিলো এই ভূখ-ের মানুষ। তাহলে কী বলবো এখনো সেই পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে? শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় সিলেবাস প্রনয়ণ ও শিক্ষাদান চলছে শিক্ষাক্ষেত্রে। পরীক্ষার নামে ছাটাই করা হয়; এমন কী ১০-১১ বছর বয়সের বাচ্চাদের পিএসসি পরীক্ষার নামে ছাটাই করা হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ শিশুকে বাইরে রেখে স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায় ৪৩ লক্ষ। সমাপনী পরীক্ষাতেই ঝরে পড়ে ১৬ লক্ষ শিশু, জেএসসি/জেডিসি’ তে  ৯ লক্ষ, এসএসসি/দাখিলে ৭ লক্ষ এবং এইসএসসিতে ৪ লক্ষ ছাটাই হয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায় মাত্র ৫ লক্ষ শিক্ষার্থী। অথাৎ প্রথম থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাটাই হয় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে সে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৮৫ শতাংশ। উচ্চ শিক্ষা শেষ করতে পারে মাত্র ৭-৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।   পূর্বেই উল্লেখ করেছি, টাকা যার শিক্ষা তার, এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে দেশ। খুব পরিকল্পিত ভাবে শিক্ষাকে একটি দুর্লভ বস্তুতে রূপান্তর করছে রাষ্ট্র। একজন দিন মজুরের ছেলে দিন মজুর হবে, রিক্সাচালকের ছেলে রিক্সা চালাবে, কৃষকের সন্তান কৃষক হবে। দিনমজুর তার দৈনিক উৎপাদিত শ্রমের       
বিনিময়ে যে অর্থ উর্পাজন করে, তা দিয়ে সংসার চলে না; ফলে বাধ্য হয়েই তার ছোট সন্তানটিকে কাজে নিতে হচ্ছে। কাজ আর পড়াশুনা যখন  ছেলেটি করে, বুর্জোয়া গণতাšিত্রক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে পড়ে ছেলেটিকে পড়াশুনা ইসতফা দিয়ে স্থায়ীভাবে কাজ করাতে বাধ্য করা। এই জন্যই বিভিন্ন পরীক্ষার নামে চলে ছাটাই করা। একটি শিশুর দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের উপর পড়ে, রাষ্ট্র কি সে দায়িত্ব পালন করছে? রাষ্ট্র তো তাকে বাধ্য করছে শিশু শ্রমে যেতে। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা শিশুর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে দিচ্ছেনা; বিশেষ শ্রেণির জন্য সব সুযোগ- সুবিধার নিশ্চয়তা দিচ্ছে রাষ্ট্র। কায়িক শ্রম শক্তির উপর নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সেই উন্নয়নের সারথী যারা তাদের ছেলে মেয়েরা কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তা তারা পাচ্ছে না। কয়েক ধারায় শিক্ষা চলছে সমাজে। ইলিংশ মিডিয়াম, সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা। যদিও সংবিধানের ১৭ ধারার ‘ক’ তে  বলা আছে, অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, একমুখী, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা। অথচ যাদের টাকা পয়সা আছে তাদের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম আর কেজি স্কুল, যারা মধ্যবিত্ত তাদের জন্য সাধারণ (সরকারি স্কুল কলেজ) মাধ্যম,  গরিবের  জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা।
তাই গরিবের টাকা না থাকার ফলে তাদের সন্তানেরা মাদ্রাসায় পড়ে পরকালে রাজত্ব করবে, এটা রাষ্ট্র ঠিক করে দিচ্ছে; ইহলোকের কাজ-কর্ম তাদের জন্য নয়, আর যারা ইংলিশ মিডিয়াম ও স্কুল কলেজে পড়ালেখা করে  তারা ইহজগতের উকিল, ব্যারিস্টার, আমলা, মšত্রী, এমপি হয়ে দেশ পরিচালনা করবে, বিষয়টা এই রকম। গত ৩০ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ১.৬০ শতাংশ এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ১.৯৭ শতাংশ; মাদ্রাসা বেড়েছে ৭.৬৭ শতাংশ এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ১২.২৩ শতাংশ। এছাড়াও ব্যাঙের ছাতার মতো কেজি স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে কোচিং সেন্টার। এর ফলে সমাজে  শ্রেণিবৈষম্য তৈরি হচ্ছে,  শিক্ষার ব্যয় ও মান দাড়ি-পাল্লার মতো উঠানামা করছে। শিক্ষার এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে যে কয়েকজন  দারিদ্রতা সহ্য করে সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন তারাও বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত শিক্ষা থেকে। কয়েকদিন আগেই অনলাইন পত্রিকায় পড়েছিলাম, শিক্ষিকা কøাসে এসে পাঠদানের পরিবর্তে বেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন। এটাইতো হওয়ার কথা। জনগণের টাকায় যে সরকারি স্কুলগুলো চলে তার নজরদারী করেন রাষ্ট্রের মšত্রী আমলারা। এখন বাংলাদেশের প্রায় সব মšত্রী, আমলাদের ছেলে-মেয়েদের কেজি স্কুলে- প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছেন। আমাদের সুনামগঞ্জের চিত্র ব্যতিক্রম নয় (আপনি খুঁজ নিয়ে যাচাই করেন)। তাদের যদি প্রশ্ন করেন, কেনো তাদের সন্তানদের কেজি স্কুলে আর প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছেন? কারণটা হয়ত আপনাদের সবারই জানা। সরকারি স্কুলে ভালো পড়াশোনা হয় না; যদি হতো তাহলে তাদের সন্তানদের কেনো ভর্তি করানো হয় না?  মাননীয় শিক্ষামšত্রী ঠিক বলেছেন, সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত, চোর। কারণ সরকারি স্কুলে চাষা, মেহনতি মানুষদের ছেলে-মেয়েরা পড়ে। এই শাসক শ্রেণির আর্বিভাব কিন্তু এক দিনে হয়নি, আমি পূর্বেই বলেছি, শিক্ষার সাথে দর্শনের সম্পর্কটা অনস্বীকার্য। দর্শনের অনুপস্থিতির কারণেই সমাজের প্রতি ব্যক্তির যে দায়বদ্ধতা তা বোধ্যগম হয়না। সে বুঝে না, সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত যে জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়, তার পিছনে কোনো না কোনো ভাবে খেটে খাওয়া মানুষের শ্রম রয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমার বেতন-ভাতা হয়; এই দায়বদ্ধতার জায়গাটুকু যত দিন সৃষ্টি না হবে, শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ বলবৎ থাকবে।
আজ আর লিখছি না। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
লেখক: ছাত্ররাজনীতিক

  • [১]