- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শিমুল বাগানে একদিন

আকরাম উদ্দিন
‘শিমুলবাগ’ সহজেই বুঝে নিতে হয়, তাহিরপুর উপজেলার ‘আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান’। শীত মওসুমে ফোটানো ফুলের জলসায় লালে লাল যেন প্রকৃতি প্রেমীদের দেয় হাতছানী। প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের মুখে হাসি ফোটায় রক্ত লালী শত সহ¯্র ফুল। শীত মওসুমে প্রায় প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এই শিমুল বাগানে। মিডিয়া কর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রায় তিন বছরে বাগানের নাম পরিচয় ছড়িয়ে পড়েছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে। বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও এলাকায় অবস্থিত এই বাগান।
যে কথা বলতেই হয়, প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করার কৃতিত্ব শুধু বাগানের নয়, আছে সুবিশাল যাদুকাটারও। বাগানের দক্ষিণ পাশে রয়েছে যাদুকাটা। উত্তর পাশেও রয়েছে যাদুকাটার নালা। শীত মওসুমে যাদুকাটার রূপ ধুঁধুঁ বালুচর। বর্ষায় স্বচ্ছ জলরাশি ও ¯্রােতধারা। বর্ষায়ও দর্শনার্থীরা আসেন শিমুলবাগে। তখন আর ফুল থাকে না। ওই বাগানের উত্তর কোণে দাঁড়ালে যাদুকাটার দুই দিকের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। এই কারণে সারা বছর দর্শনার্থীরা আসেন এবং একনজরে বাগান ও যাদুকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখেন। সেই সাথে নিরবে-নিভৃত্তে ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে কিছু সময় হাসিখুশি থাকতে পারেন দর্শনার্থীরা। আবার কেউ কেউ বনভোজনও করেন এই বাগানে।
প্রতি বছর শীত মওসুমে যেমন বাগানে যাই, তেমনভাবে আমরা ক’জন মঙ্গলবার সকালে যাত্রা করি শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে। নোহা গাড়ি করে সুনামগঞ্জ শহর থেকে বাবলু ভাইয়ের নেতৃত্বে শাহীন ভাই ও খলিল ভাইয়ের পরিকল্পনায় আমি ও আসাদ মনি সহযাত্রী হই। আমরা সবাই সাংবাদিক। আব্দুজ জহুর সেতু পার হয়েই পড়ি ভাঙা সড়কে। ঝাঁকুনিতে একে অপরের মাথায় টেস্ খেতে খেতে যাচ্ছি। মনে মনে ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছি আমরা। তবুও মেনে নিচ্ছি। কারণ সুনামগঞ্জের সড়ক ও নদী ভাঙন প্রতিরোধে উন্নয়ন কতিপয় ঠিকাদারের চুরির পরে যা হয়। সম্ভবত: এমনটাই হয়েছিল এই সড়কের উন্নয়নে। কিছুক্ষণ পর পলাশে পৌঁছে দুধের চা ও বন রুটি খেলাম। গাড়ি না থামিয়ে সোজা এক টানে মিয়ারচরে পৌঁছলাম।
দুপুরে গাড়িটি রেখে মিয়ারচরের যাদুকাটা নদীর ফেরি পার হয়ে পাঠানপাড়ায় পৌঁছি। পরে মটরবাইক করে ঘাগড়া গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ মাটির সড়ক, একইভাবে গড়কাটি পর্যন্ত যাই। মাটির সড়কের ধুলোবালিতে মনে হয়েছে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এই এলাকার রাস্তা-ঘাটে। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মটরবাইক চলে সেটা বোধ হয় দায়িত্বশীলদের মাথায় নেই। নইলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক কেন থাকবে গ্রামের ভেতরে। এরপর ঘাগটিয়া গ্রামের ভেতর দিয়ে ভাঙা সড়কেই চলেছি। ভাঙাচুরা সড়কে হায়রে ঝাঁকুনি। একই সড়কে চকবাজার হয়ে মানিগাঁও গ্রামে শিমুল বাগানে পৌঁছি।
বাগানে প্রবেশের আগে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছি বিশাল এই শিমুল বাগানের সীমানা প্রাচীর বাঁশের কঞ্চি ও কাটা তার দিয়ে বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে। প্রবেশ গেইটে লেখা আছে ‘আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান’। গেইটের সামনে মটরবাইক ও গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান। সাইনবোর্ডে লাল তীর দিয়ে দেখানো হয়েছে ‘মানিগাঁও নদীরপাড় বায়তুল আমান জামে মসজিদ’। মুল গেইটের এক পাশে রয়েছে প্রতিজনে প্রবেশ ফিস ২০ টাকা লেখা।
এরপর আমরা বিনা ফিসে প্রবেশ করলাম শিমুল বাগানে। কারণ আমরা ভিআইপি আদরে সেখানে বেড়াতে যাই। বাগানে দেখি আগত দর্শনার্থীর প্রায় সকলের চোখ উপর দিকে। শিমুল গাছের মগডালে। ফোটানো লাল ফুল দেখে আনন্দ উপভোগ করছেন তাঁরা। এই সময় বাবলু ভাই, শাহীন ভাই ও খলিল ভাই চলে গেলেন কুশল বিনিময় করতে বাগানে অপেক্ষমান প্রয়াত জয়নাল আবেদীন সাহেবের ছেলে নিজাম উদ্দিন ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাকাব উদ্দিন এবং শিক্ষক গোলাম সরোয়ার লিটনের সাথে।
আমি ও আসাদ চলে গেলাম বাগানের দর্শনার্থীদের নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে। আমরা দেখলাম একজন দর্শনার্থীর বাগানে হাঁটা চলা, বসা, পানি পান, চটপটি, চানাচুর, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম খাওয়ার সুবিধা তাঁর হাতের কাছে। আছে ফুল বিক্রেতা ও আলপনা এঁকে দেয়ার লোক। লাল ফুলে আঁকানো লাভ চিহ্নে ছবি উঠার সুবিধা। দর্শনার্থীদের কাছে কাছেই আছে একাধিক ক্যামেরাম্যান। ছবি তোলা তাঁদের পেশা। আপনার মেমোরি কার্ড দিয়ে ছবি তোলে দেবে সে। বিনিময়ে কিছু টাকা দিতে হবে। বিশেষ বিনোদন হিসাবে রয়েছে অনেকগুলো মায়াবী চেহারার ঘোড়া। এদিক ওদিক ছুটে বেড়ালাম দু’জন। বেশ ভালই লাগল। একসময় হঠাৎ ডাকলেন খলিল ভাই- সবাই মেহেদী রেষ্টুরেন্টে খাবার খেতে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আসার সময় সবাই মিলে আরও একবার ঘুরে দেখলাম পুরো বাগানটি। বাগান থেকে যাদুকাটা নদী পিছনে রেখে নানা ভঙ্গিতে ছবি উঠলাম বার বার। জেলার বাইরের একাধিক পর্যটকের সাথেও কথা হয়। তারাও এসেছেন সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার থেকে। যারা সরকারী কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি তাঁদের ভিজিটিং কার্ডও আদান প্রদান হয় আমাদের হাতে। রাস্তা-ঘাটের জটঝামেলা এড়িয়ে যেতে পারলে অবশ্য বিনোদনের কমতি হবে না। পরিচয় হবে বিভিন্ন স্থানের দর্শনার্থীদের সাথে। এক অনাবিল আনন্দে এবং মিলন মেলায় কেটে যাবে একদিন।

  • [১]