বিশেষ প্রতিনিধি
‘বাড়ির হমকের (সামনের) গাঙয়ের পাড় খেলরাম, দেখি দা রামদা খুচা লাটি লইয়া কত মানুষ আইছে, মা’রে দৌড়াইয়া আইয়া কইলাম, মায়ে দিদিরে কইছইন রুমারে (১০ বছরের শিশু কন্যা) ধর মা, আমারে ধরছইন তাইন, আমি কান্দি, মায়ে কইন কান্দিছ না বাবা, দৌঁড়াইতে থাক, ধানের মাঝখান দিয়া দৌড়াইতে দৌঁড়াইতে নারাইনপুর গেছি, পরের দিন আইয়া সবতা ভাঙা দেইক্কা, মা বাবা বইন সবে কানছইন, আরেকবার তারা আইতো পারে, ইতার লাগি খেলাত যাই না, ঘর থাকিঔ বারাই না।’ নোয়াগাঁয়ের শৈলেন দাশ ও লুবন দাশের ৭ বছরের শিশু শিশির সোমবার এভাবেই নিজের অজানা আতঙ্কের কথা সাংবাদিকদের বলছিল।
শিশিরের মা লুবন রানী দাস বললেন, ‘চৈত্র মাসের ২ তারিখ গেছে গ্রামের পাশের সোমেশ^রীর মেলা, ফাল্গুনের ২৬ তারিখ আছিল অহরাত্র অনুষ্ঠান, বড় মেয়ে বন্যা ও দুই নম্বর মেয়ে চম্পা আইছিল বাড়িত, মেলা ও অহরাত্র পরে তারারে জামাইয়ে নিতোগি চাইছিল, কইয়া রাখছিলাম কয়টা দিন থাকতো, এর মাঝে ই-ঘটনা, দৌঁড়াইয়া জীবন বাছাইছি, বাড়িত আইয়া দেখছি আলমিরা, ওয়ারড্রব সব ভাঙা, বন্যা- চম্পার গলার চেইন কানের দুল ভালা শাড়ি একটাও নাই, বড় মেয়েডা কানতে কানতে (কাঁদতে-কাঁদতে) কাইল গেছে (শ^শুর বাড়ি কালিয়াজুরি চাকুয়া), দুই নম্বর মেয়েডাও যাইবো গি, আমার চামেলী (১০ম শ্রেণির ছাত্রী), চন্দনা (৮ম শ্রেণির ছাত্রী) ও ছোট মেয়ে রুমায় কান্দে (কাঁদে), অখনোও ডরায় (ভয় পায়) হেরা, তারা (হামলাকারী) ৩৩ জন ধরা পড়ছে, আরও তো আছে, কোন সময় যে কোনটা অয়।’
শৈলেন দাশ অবশ্য বললেন, ভয় তো আছেই, পুলিশ থাকায় সাহস পায়রাম। তিনি জানালেন, মেয়ে দুটির শ^শুর বাড়ির কাছে লজ্জায় পড়েছেন। ছেলে মেয়েরা তাকে বাইরে কাজে যেতে দেয় না। জোর করে যেতে হয়, মন খারাপ করে তারা।
গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাশের ছেলে লিটন চন্দ্র দাশ বললেন, হামলাকারীরা হামলা করে ফেরার সময় বীরের মতো ফেসবুকে লাইভ করতে করতে গেছে। তাদের অনেকে এখনো গ্রেপ্তার হয় নি। এজন্য ভয় কাজ করছে গ্রামবাসীর মধ্যে। গ্রামের মানুষ সব সময়ই বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়েছে। বুধবারের পরে কেউ রাতে বাতি নিভিয়ে ঘুমায় না। দিনের বেলার চেয়ে রাতে ভয়ে বেশি থাকে সবাই। সোমবার শাল্লা উপজেলা সদরে জরুরি কাজে যেতে হয়েছে। যাওয়ার সময় মা বাধা দিয়েছেন। পরে অনেক বুঝিয়ে বের হলেও পথে যেতে যেতে অনেকবারই বাড়ি থেকে ফোন করা হয়েছে। বাড়ি ফেরা পর্যন্ত সবাই চিন্তিত ছিলেন।
লিটন জানালেন, এখন স্কুল খোলা না থাকায় সারাদিন বাড়ির পাশের মাঠে শিশু, কিশোর. কিশোরীরা খেলাধুলা করতো। বুধবারের ঘটনার পর থেকে বাড়ির বাইরে খুব কমই বের হচ্ছে শিশুরা। বললেন, বাচ্চাদের আতঙ্ক বেশি।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নান্টু দাশ জানালেন, এখন ক্ষেতে কাজের সময়, কিন্তু অনেকে ভয়ে হাওরে যাচ্ছে না। যারা হামলা করেছে, তারা ঘুরে বেড়ানোয়- ভয় কাটছে না তাদের।
ভানু রঞ্জন দাশ জানালেন, হামলার ঘটনার পর গ্রাম থেকে দিরাইয়ে ভয়ে যাচ্ছে না কেউ। শ্যামারচর বাজারে যেতেও ভয় পাচ্ছে।
গ্রামের অনেকেই জানালেন, হামলাকারীরা হাওরে গরু ছড়িয়ে তাদের ধানের ক্ষতি করার কথাও শুনছেন তারা।
শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক বললেন, ফেসবুকে লাইভ দেবার অনেক ভিডিও ফুটেজ পুলিশের কাছে আছে। যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে ওদের অনেকের পরিচয়ও সনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক ইউনিট আসামী গ্রেপ্তারের জন্য কাজ করছে। বিভিন্ন দিকে অভিযান হচ্ছে, আরও অপরাধী গ্রেপ্তার হবে।
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা বুধবার হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করেছে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮ বাড়িতে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দির ভাংচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়।
গেল ১৫ মার্চ সুনামগঞ্জের দিরাই স্টেডিয়ামে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। এসময় ধর্মীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন মামুনুল হকসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা।