- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শিশু-কিশোরদের এই নষ্ট হওয়ার পথ থেকে ফিরান

জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার একটি চরম সংকট ও নির্মম বাস্তবতার কথা ফুটে উঠেছে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ‘ঝরে পড়ছে হাওর পাড়ের ছাত্ররা’ শিরোনামের সংবাদ প্রতিবেদনে। আমাদের জামালগঞ্জ অফিস থেকে প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার সরেজমিনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিবেদনটি রচিত হলেও এই বাস্তবতা কমবেশি পুরো উপজেলার। বলা যেতে পারে সারা জেলা এবং দেশের গ্রামাঞ্চলের চিত্র এরকমই। জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের শাহপুর নতুন রাস্তার মোড়, ওই গ্রামের মোছাব্বিরের বাড়ির পাশে, বাধবাজার, নয়াহালট, চানপুর হারুন মার্কেট, সোনাপুর গ্রামের বিভিন্ন দোকান, লক্ষীপুর, উজান লালপুর ও ভাটি লালপুর, গজারিয়া, সেলিমগঞ্জ, রামপুর, গজারিয়া, জামলাবাজ এমন স্থানগুলোর দোকান ও রাস্তার পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ক্যারাম, লুডু ও গাফলা খেলার ব্যবস্থা এবং ভিডিও গেম শপ। দল বেঁধে কমবয়সী ছেলেরা যাদের একটি বড় অংশ পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র, ব্যাপকভাবে এইসব খেলা ও ভিডিও গেমে জড়িয়ে পড়েছে।  এমনকি ভিডিওতে অশ্লীল ছবি দেখানোর ব্যবস্থাও রয়েছে কিছু জায়গায় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিদ্যালয় সময়ে প্রচুর ছাত্রদের এসব নেশায় মত্ত থাকতে দেখা যায়। সংগত কারণেই বুঝা যায়, বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে ছাত্ররা এইসব অবৈধ নেশায় লিপ্ত রয়েছে। এইভাবে নেশাসক্ত হয়ে একটি বড় সংখ্যার শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। অভিভাবকরা এ নিয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছেন। জামালগঞ্জে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম একটি কারণ হিসাবে এইসব খেলা ও ভিডিওকে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে দায়ী করা হয়েছে।
জামালগঞ্জের কিয়দংশের বাস্তবতা নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে, সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন সারা জেলার মফস্বলগুলোতেই এই চিত্র বিরাজ করছে। খোদ জেলা শহরের পৌর মার্কেটেও কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকটি ভিডিও গেমের দোকান দেখা গেছে যেখানে দিনের বেলায় কিশোররা রীতিমত লাইন দিয়ে অংশ নিত। সুতরাং শিক্ষার অনগ্রসরতার যেসব কারণ সামনে এসেছে তার মধ্যে যে এই খেলা ও ভিডিওর নেশা অন্যতম তা স্বীকার করতেই হবে।
এই অবৈধ উপাদানগুলো শুধু যে বিদ্যালয় থেকেই ছাত্রদের বের করে আনছে শুধু তা নয়। এর মধ্য দিয়ে ছাত্ররা শিশু ও কিশোর বয়সেই একটি কালো জগত ও অবৈধ বৃত্তির সাথে পরিচিত হয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যায়। এই শিশু-কিশোররা নিজেদের তলিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারেও বিপর্যয় ডেকে আনছে। ক্যারাম, লুডু কিংবা গাফলা খেলা হয় পয়সার বিনিময়ে। নিজেদের মধ্যে বাজি ধরার একটি বিষয় আছে। অন্যটি হলো যে ব্যক্তি খেলার আয়োজন অর্থাৎ জায়গা ও উপকরণ দিচ্ছে তাকে টাকা দিতে হয়। ভিডিও দেখতে কিংবা গেম খেলতেও লাগে টাকা। এই টাকা জোগার করতে শিশুরা প্রথমে ঘরের ভিতর চুরি করা শেখে, পরে বাইরেও এই বিদ্যা প্রয়োগ করে। সুতরাং সামাজিক এই ব্যাধি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে উপায় নেই।
আশ্চর্যের বিষয় হলো এইসব আয়োজন দিনের আলোয় প্রকাশ্যে করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ আটকানোর চেষ্টা করছেন না। স্থানীয় ব্যক্তিগণ পারছেন না হয়তো সাহসের অভাবে, কিন্তু এলাকার জনপ্রতিনিধি ও নানা নামে গড়ে উঠা অসংখ্য সংগঠনের চাঁইরাও কোন উদ্যোগ নেন না। প্রশাসন তো নাকে সরষের তেল দিয়ে সবসময়ই ঘুমন্ত থাকে। সকলের সামনেই আমরা একটি একটি করে প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। এই অবস্থার অবসানে কি কারো কিছু করণীয় নেই? আমরা কোন নীতিকথা কিংবা আশ্বাসবাণী শুনতে রাজি নই। যারা নষ্ট হওয়ার উপকরণ বিছিয়ে আমাদের সন্তানদের উচ্ছন্নে নিচ্ছে এককথায় তাদের কঠোর হস্তে দমন করার অনুরোধ আমাদের। এই অনুরোধ স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃবৃন্দ সহ সচেতন সকলের প্রতি।

  • [১]