মানুষ জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে প্রথম ভাষা শিখে। বলা যেতে পারে মা—ই শিশুর ভাষা শিক্ষার প্রথম শিক্ষক। মায়ের কাছ থেকে শিখা ভাষাই মাতৃভাষা। এই ভাষা শিশুর মনে—মস্তিস্কে গেঁথে থাকে। পরে সে আর যত ভাষাই শিখুক না কেন, চিন্তার জগতে সে সবকিছুই মাতৃভাষায় বিন্যস্ত করে। মানুষ চিন্তা করে মাতৃভাষায়, স্বপ্ন দেখে মাতৃভাষায়। জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে শিখা মাতৃভাষার প্রভাবমুক্ত হতে প ারে না সে মৃত্যুবধি। তাই দেশে দেশে, জাতিতে—জাতিতে মাতৃভাষার অন্যরকম কদর। নিজের জীবন যেমন প্রিয় তেমনি মাতৃভাষাও সমান প্রিয় ব্যক্তি মানুষের কাছে। এই ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার অর্থ হলÑ গাছকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এরকম প্রয়াস আমরা দেখেছিলাম পাকিস্তানি শাসনামলে, বাংলাকে নির্বাসনে পাঠানোর পাকিস্তানি অপপ্রয়াস থেকে। কিন্তু সেই অপপ্রয়াস রুখে দিয়েছিল সংগ্রামী ভাষাপ্রিয় বাঙালি সমাজ। সে—সময় ভাষার অধিকার প্রশ্নে এক প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালি মননে। সেই চেতনা ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নে। জাগৃতি ঘটেছিল স্বদেশ নির্মাণের। আক্ষরিকভাবে তার বাস্তবায়ন ঘটেছে ঠিক, তবে সেই জাতীয়তাবাদী চেতনার স্তরে স্তরে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে মনুষত্ববিনাশী নানা অনুষঙ্গ। সেখানে সকলে মিলে এক জাতি হয়েও ধন ও সম্পদের নিরিখে, ধর্ম পরিচয়ের নিরিখে বিভাজন করা হয়ে গেছে আরও বহু ভাগে—উপভাগে। পাকিস্তানি শাসনামলে যে বাঙালি—অবাঙালি বিরোধের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছিল তাই এখন বাঙালির ভিতর নানা রূপে প্রকটিত হয়েছে। যাহোক প্রসঙ্গ এটি নয়। প্রসঙ্গ মাতৃভাষার চর্চা নিয়ে। রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সরকারি কাগজপত্রে সহজ ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি শুদ্ধ ভাষা চর্চার উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, পরিবারে অভিভাবকদের শুদ্ধ ভাষার চর্চা করতে হবে যাতে শিশুরা শুদ্ধ ভাষা পরিবার থেকেই শিখার সুযোগ পায়। আপাত দৃষ্টিতে এরকম কথার মধ্যে কোন বিরোধ দেখা যায় না, বরং বেশ সুখশ্রাব্যই ঠেকে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝা যাবে এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার চিরাচরিত সকল বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। বাংলাদেশের বাঙালি জাতি—গোষ্ঠীর সকলে প্রমিত বাংলায় কথা বলে না। সে—রকম পারিবারিক চর্চাও নেই। কেবল উত্তরবঙ্গের কিছু অঞ্চলে প্রমিত বাংলার আদলে ভাষার কথ্য রূপের দেখা মিলে। বাকি বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেরই রয়েছে নিজস্ব আঞ্চলিক কথ্য ভাষারীতি, যার একটির সাথে অন্যটির কোন মিল নেই। সিলেটের কথ্যভাষার সাথে চট্টগ্রামের কিংবা নোয়াখালির সাথে বরিশালের কথ্যভাষার ফারাক বিস্তর। মূলত বাংলা ভাষা হলেও অঞ্চলভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ সংশ্লিষ্ট ভাষাটিরই ঐশ্বর্য। এই যে এখন শুদ্ধ ভাষার চর্চার কথা বলা হচ্ছে তা তো আমাদের পারিবারিকভাবে চর্চিত আঞ্চলিক কথ্যভাষার উপর আরেক জবরদস্তি। এর মধ্য দিয়ে সাত দশক আগের বাংলা—উর্দু বিরোধের কথাই মনে হয়। মানুষ অনায়াসে যে ভাষার চর্চা করতে পারে তাই মাতৃভাষা। চেষ্টা করে যে ভাষা শিখে তা কখনও মাতৃভাষা হতে পারে না। আরোপিত ভাষা চাপিয়ে মূলত ব্যক্তির সহজাত বিকাশ—প্রবণতাকে আটকে রাখা হয়। অনেকটা নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে ভিন্নখাতে বইয়ে দেয়ার মত কৃত্রিমতায় পরিপূর্ণ। সুতরাং পারিবারিকভাবে নিজের আদি ও অকৃত্রিম মাতৃভাষার পরিবর্তে শুদ্ধভাষা চর্চার উপদেশ দান আরেকধরনের বিচ্ছিন্নতা আনয়নের প্রয়াস বলেই মনে হয়। এই ধরনের চিন্তা থেকে সকলকে সরে আসতে হবে।
এখনও আমাদের অধিকাংশ মানুষই উপযুক্ত মানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত ব্যাপক জনগোষ্ঠীটি শুদ্ধ ভাষা চর্চার জায়গায় সংগত কারণেই পিছিয়ে থাকবে। এইভাবে জনগোষ্ঠীর মাঝে আরেকটি মোটাদাগের ফারাক তৈরি হওয়ার পথটিও অবারিত হয়ে যায়। সুতরাং প্রমিত বা শুদ্ধ ভাষা চর্চার সাথে পারিবারিকভাবে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত মাতৃভাষা চর্চার জায়গাটিকে সংকুচিত না করে একে উৎসাহিত করা জরুরি বলে আমরা মনে করি।