বর্তমান আত্মকেন্দ্রিক সময়ে সাধারণত কেউ অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় না। না জানি কোন ঝামেলায় জড়াতে হবে এই ভয় কাজ করে সকলের মনে। এর মাঝেও কিছু মানুষ রয়েছেন যারা এমন চিন্তা মাথায় না এনে বিপদ দেখলেই সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এমনই ব্যক্তি ছিলেন নবীনগরের মুদি ব্যবসায়ী ফারুক মিয়া নামের ৪০ বছর বয়সী এক যুবক। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার নবীনগর পয়েন্টে রোমান মিয়া ও ঝুমন মিয়া নামের দুই ইজিবাইক চালকের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। রোমান মিয়ার ইজিবাইককে ঝুমন মিয়ার ইজিবাইক ধাক্কা দিয়েছে, এমন তুচ্ছ কারণেই কথা কাটাকাটি। পরে এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। ঝুমন মিয়া ফোন করে বখাটে সন্ত্রাসীদের নিয়ে আসে এবং সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধভাবে দেশীয় অস্ত্র সহকারে রোমানের উপর হামলা চালায়। ঘটনাস্থলের পাশে অবস্থান করা যুবক ফারুক মিয়া এই মারামারি থামাতে যান। তখন সন্ত্রাসীরা ফারুক মিয়ার উপর ছুরিকাঘাত করে। রোমান মিয়াও ছুরিকাঘাতে মারাত্মক জখম হন। ফারুক মিয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন আর রোমান মিয়াকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন হত্যাকাণ্ড শহরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন জনের পোস্ট থেকে জানা যায় নিহত ফারুক মিয়া একজন সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত বিচার দাবি জানানো হচ্ছে এইসব পোস্টে। তাঁর এমন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু গোটা একটি পরিবারকে বিপর্যস্ত করে তোলেছে। গুরুতর আহত রোমান মিয়ার পরিবারও নিশ্চয়ই একই পরিণতির শিকার। এরকম ভয়াবহ সন্ত্রাসীপনা আজকাল প্রায়শই লক্ষ্য করা যায়। এতে একসময় শান্তির শহর হিসাবে সুখ্যাত সুনামগঞ্জ আজ অশান্তির শহরে পরিণত হয়েছে।
অসহিষ্ণু মানসিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সমাজের নানা স্তরে। ঝুমন মিয়া নামের ওই ইজিবাইক চালক একটু চিন্তাও করল না সামান্য একটি ঘটনাকে খুনোখুনির পর্যায়ে নিয়ে গেলে কী বিপদ নেমে আসতে পারে। তার ডাকে যে সন্ত্রাসীরা ছুড়ি, রাম দা ও লাঠি নিয়ে মারামারি করতে চলে আসল তারা নিশ্চয়ই চিহ্নিত অপরাধী। শুধু অপরাধীই নয়, এরা কাউকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না। অর্থাৎ এরা অভ্যাসগত অপরাধী। এদের হাতে কোনো এলাকা বা সমাজ নিরাপদ নয়। অথচ এরা প্রকাশ্যেই চলার ক্ষমতা রাখে। এরকম কতো অপরাধীচক্র এই শহরে ছড়িয়ে রয়েছে তার পরিসংখ্যান কে দিবে? এদের হিং¯্র ও পাষণ্ড মনেবৃত্তির শিকার হয়ে এক সজ্জন ব্যবসায়ীর প্রাণ গেলো। এমন নির্মমতাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সকলের মতো আমরাও দাবি জানাই, নিহত ফারুকের হত্যাকাণ্ডে জড়িত রোমান মিয়াসহ সকল সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হোক। এই সন্ত্রাসীরা যাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো মহলের আশ্রয় প্রশয় না পেতে পারে সে অনুরোধ জানাচ্ছি আমরা।
অসহিষ্ণুতরার লক্ষণ শুধু জেলা শহরেই নয়। সর্বত্রই এমন অবস্থা। সম্প্রতি ছাতকে লায়েক মিয়া নামের এক যুবলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এখন শুরু হয়েছে রাজনৈতিক পক্ষ প্রতিপক্ষের পাল্টাপাল্টি তৎপরতা। নিহত লায়েক মিয়ার পরিবার পরিজন বুঝতে পারছেন স্বজনকে হারিয়ে তারা কেমন কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পক্ষ বিপক্ষের কাছে লায়েক মিয়ার মৃত্যু কেবলমাত্র একটি হাতিয়ার। এই হাতিয়ার দিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করতে চাইছেন। এই যে মানুষের জীবন নিয়ে রাজনীতি, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অশুভ প্রবণতা: তাই নষ্ট করছে আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা, সহিষ্ণুতা এবং সামাজিক কাঠামো। এইসব প্রাণঘাতি অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রতিরোধের জাগৃতি দরকার।