- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শেখ রাসেলের নামকরন

এস ডি সুব্রত
শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্ম হয় ১৯৬৪ সালে ১৮ অক্টোবর ধানম-ি বত্রিশ নম্বরের বাসায়। রাজনৈতিক ব্যস্ততা আর জেল জুলুমের কারণেই শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব কম সময়ই কাছে পেয়েছে রাসেল। একসময় তার মা শেখ ফজিলাতুন্নেসা তাকে বাবা ডাকতে শিখিয়েছিলেন। জন্মের মুহূর্ত লিখতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলছেন, রাসেলের জন্ম হয় ধানম-ি বত্রিশ নম্বর সড়কের বাসায়, আমার শোবার ঘরে। উত্তর পূর্ব দিকের ঘরটা আমার ও কামালের। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম নিলো রাত দেড়টায়।’ শেখ রাসেলের পুরো নাম শেখ রিসাল উদ্দিন রাসেল। রাসেল নামকরণেরও একটি ইতিহাস আছে। বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের বই পড়ার প্রতি ছিল প্রচুর নেশা। বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ছিলেন একনিষ্ঠ ভক্ত। বার্ট্রান্ড রাসেল শুধু দার্শনিকই ছিলেন না, ছিলেন বিজ্ঞানী ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। ছিলেন পারমানবিক যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের বিশ্বনেতা। বিশ্ব শান্তির জন্য গঠন করেছিলেন ‘কমিটি অব হান্ড্রেড’। শেখ রাসেলের জন্মের দু-বছর পূর্বে ১৯৬২ সালে কিউবাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন দ্বারপ্রান্তে তখন শান্তির পতাকা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যে তাঁদের যদি পুত্র সন্তান হয় তাহলে বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সাথে মিল রেখে নাম রাখবেন রাসেল। বাবা মুজিব হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁর ছোট ছেলে আপন প্রতিভায় একদিন দীপ্ত হয়ে উঠবে।
শেখ রাসেলের যখন দেড় বছরের কিছু বেশি বয়স সেসময়টায় বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি পেশ করেন, তখন পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে এনে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে কারাগারে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য প্রেরণ করে। শিশু রাসেল তখন প্রথমবারের মত মায়ের সাথে কারাগারে পিতাকে দেখতে যান। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচায় বলেছেন, ‘৮ ফেব্রুয়ারি দুই বছরের কম বয়সী ছেলে এসে বলে, আব্বা বালি চলো। কী উত্তর দিব ওকে? ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ওতো বুঝেনা আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম তোমার মা’র বাড়ি তুমি যাও, আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়? কি করে আমাকে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে’। রাসেলের নামকরণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘অনেক বছর পর একটা ছোট্ট বাচ্চা আমাদের বাসায় ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আব্বা বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, বার্টান্ড রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখেন।’ হাসু আপু অর্থাৎ শেখ হাসিনার হাত ধরে হাঁটতে শেখা ও তার হাতে খাওয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছিল ছোট রাসেল। রাসেলের বেড়ে ওঠার কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘রাসেলের সবকিছুতেই যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে অত্যন্ত মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবেই আমরা পেয়েছি। আমাকে হাসুপা বলে ডাকতো। কামাল ও জামালকে ভাই বলতো আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না। আমরা নাম বলা শেখাতে অনেক চেষ্টা করতাম। কিন্তু ও মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। চলাফেরায় ও বেশ সাবধানী এবং সাহসী ছিল, সহজে কোনও কিছুতে ভয় পেতো না। কালো কালো বড় বড় পিঁপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা কালো পিঁপড়া ধরে ফেলল, আর সাথে সাথে পিঁপড়াটা ওর হাতে কামড়ে দিল। ডান হাতের ছোট্ট আঙুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। তবে ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিলো। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলে বলতো ‘ভুট্টো’।’
রাসেলের কোমলমতি মনের উদাহরণ আনতে গিয়ে আরেকটি ঘটনারও উল্লেখ করেন তার প্রিয় হাসুপা। তিনি লিখেছেন, ‘মা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। রাসেলকে কোলে নিয়ে নীচে যেতেন এবং নিজের হাতে খাবার দিতেন কবুতরদের। হাঁটতে শেখার পর থেকেই রাসেল কবুতরের পেছনে ছুটতো, নিজ হাতে ওদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত। রাসেলকে কবুতরের মাংস দেওয়া হলে খেত না। ওকে ওই মাংস খাওয়াতে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিয়ে গেছি, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ওই বয়সে ও কী করে বুঝতে পারতো যে, ওকে পালিত কবুতরের মাংস দেওয়া হয়েছে!’
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

  • [১]