- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

শোককে শক্তিতে রূপান্তরের দিন আজ

অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক
“—আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়Ñ তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং—মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
যে বজ্রকন্ঠের আহবানে বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছিলÑঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, সারা বাংলার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান মিলে মিশে একাকার হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাত্র নয় মাসে পরাজিত পর্যুদস্ত করেছিল বিশ্বখ্যাত পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে, জাতির জনকের সেই কন্ঠ স্তব্ধ করে দিল এদেশেরই কতিপয় কুলাঙ্গার-বিশ্বাসঘাতককের নিক্ষিপ্ত বুলেট পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালো রাত্রিতে। সেই মীরজাফর মুশতাক-ফারুক-ডালিম চক্র আর তাদের মদদদাতাগণ পর্যায়ক্রমে ক্ষমতার মসনদে বসে বাংলাদেশÑজিন্দাবাদ স্লোগান আর রেডিও বাংলাদেশ প্রচারযন্ত্র ইত্যাদি পাকিস্তানী আদলে প্রবর্তন করে পেছনের দিকে ফিরিয়ে নিতে থাকল বাংলার মানুষকেÑবাংলাদেশকে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করে বন্ধ করে রাখল ইতিহাসের এই বর্বরতম হত্যাকা-ের বিচার।
কিন্তু যে জাতি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে সামনে নিয়ে অগ্রসরমান, তাঁদেরকে কতদিন দমিয়ে রাখা যায়? মুজিবাদর্শের সৈনিকরা আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে থাকলÑতাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে শক্তি অর্জন করে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলেন। বাতিল করা হল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামীয় কালো আইনÑঅদম্য সাহস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে দেশের চলমান আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ব্যবস্থা নিলেন। দেড়শ’ কার্যদিবস শুনানীর পর ১৯৯৮ সনের ৮ নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ গোলাম রসুল ২০ আসামীর মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদ-াদেশ দিলেন। আসামীদের আপীল আর হাইকোর্ট বিচারপতিগণের বিব্রতবোধের পালায় পড়ে আপীল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হতে থাকল। পরবর্তীতে আরও বাধা এল, বিএনপি  
জামাতের জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেমে গেল বিচার কার্যক্রম। আল্লাহর সাহায্যে যখন আবারও বিজয় এল Ñদ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে সহ¯্র হুমকির মুখে ভীত না হয়ে পৃথিবীর জঘন্যতম এ হত্যাকা-টির বিচার সমাপ্ত করলেন। বীর বাঙালি জাতির কলংক মোচন হলÑদায়মুক্ত হল বাংলাদেশ। তাইতো আব্দুল গাফফার চৌধুরী গ্রীক-পুরানের আগামেমনন কন্যার সাথে তুলনা করে প্রশ্ন রেখেছেন,“বাংলাদেশে সেই ইলেকষ্ট্রা কি শেখ হাসিনার মধ্যে পূনর্জাগরিত হয়েছেন?”
ত্রিশ লাখ বাঙালির শাহাদত বরণ যার একটি আহবানে সম্ভব হয়েছিলÑজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ টুঙ্গীপাড়ায় শুয়ে থাকলেও তাঁরই সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্যতম নেতৃত্বে বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছে। আজ দেশের টাকায় পদ্মা সেতু হয়, গ্রাম গ্রামান্তরে নদী খাল নালায় বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে ব্রিজ কালভার্ট হয়, প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট বড় রাস্তা পাকাকরণ হয়, সড়ক-রেল-নৌ-বিমানের সকল রুটে গমন সহজতর হয়, বঙ্গবন্ধুর অনুকরণে দেশে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় একযোগে সরকারি করণ হয়, প্রত্যেক উপজেলায় পর্যায়ক্রমে হাইস্কুল কলেজ জাতীয়করণ হয়, ভেতো বাঙালির ঘরে ঘরে সুলভে ভাত যোগাড় হয়, একযোগে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনভাতা দ্বিগুন হয়, বয়স্ক-বিধবা-প্রতিবন্ধীগণকে ভাতার আওতায় আনা হয়, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানজনক ভাতার মাধ্যমে জীবন পরিচালনার ব্যবস্থা হয়, প্রতিটি গৃহে বিদ্যুতের আলোক জ্বালাবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ হয়, জেলে-চাষী সকলের কার্ডের প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকারী সুবিধা গ্রহণ নিশ্চিত হয়, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দোরগোরায় গ্রামের মানুষের চিকিৎসা হয়, দেশের রফতানী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার্জন, রিজার্ভ তহবিল ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কের উন্নতি হয়Ñএমনি অনেক অনেক ক্ষেত্রের সুস্পষ্ট উন্নয়ন সাধিত হয় নেতৃত্বের ত্যাগী ন্যায়নিষ্ঠ, সংযমী, দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে।
তবুও বসে নেই স্বাধীনতার শত্রুপক্ষের প্রেতাত্মারা। যেভাবে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা করেছিল, গুলিস্থান সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেনেড হামলা করেছিল ঠিক সেভাবে না পারলেও মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গুলশান/শোলাকিয়া ট্রাজেডী সেগুলোরই নবতর সংস্করণ। কিন্তু মানুষকে বিপথগামী করে আত্মঘাতী কিলিং মিশন তৈরি করে এভাবে নিরপরাধ মানুষ হত্যা ইসলাম সম্মত তো নয়, কোন ধর্মসম্মতই নয়। এদেরকে প্রতিরোধ করতেই হবে।
তাই ১৫ আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাংলার প্রতিটি মানুষকে সচেতন, সতর্ক আর সদা প্রস্তুত করে তুলতে হবেÑব্যক্ত করতে হবে সোনার বাংলা গড়ার দৃপ্ত অঙ্গীকার। কারো সন্তান যাতে বিপথগামী না হতে পারে সেজন্য প্রত্যেক অভিভাবককে হতে হবে অধিকতর দায়িত্বশীল আর পূর্ণ সচেতন। কোথাও নতুন লোকের আবির্ভাব নজরে এলে নিকটস্থ সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করতে হবে সঙ্গে সঙ্গে।  
লেখক: চেয়ারম্যান, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ

  • [১]