সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য
সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কুবাজপুর গ্রামে ১৯৪১ খ্রীস্টাব্দের একুশ মে যে ফুটফুটে শিশুটির কান্নার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল, বাবা-মা আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন রফিকা চৌধুরী। মাত্র পনরো বৎসরের গ-ি পেরোনোর আগেই নবরূপে যিনি একই উপজেলার বনগাঁ নিবাসী জনাব আব্দুর রইছ সাহেবের পতœী হয়ে সংসার জীবন শুরু করলেন তাঁরই নাম হয়ে গেল রফিকা রইছ চৌধুরী। পারিবারিক জীবনে আত্মীয়-স্বজন বেষ্টিত রফিকা রইছ চৌধুরী স্নেহ, সোহাগ, ভালবাসায় সিক্ত হয়ে সকলের সাথে সু-সম্পর্কের এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন যেখানে বন্ধু পাড়া-পড়শিরাও ছিলেন নিবিড়ভাবে যুক্ত। সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরে বাসা হল স্বামীর, আইনজীবী হিসেবে সুনামগঞ্জ বারে যোগদানের কারণে। একে একে ঘর আলো করে জন্ম হলো ছয় সন্তানের। স্বজন-সুজনের পরিসরও প্রসারিত হতে থাকলো। সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনে অগ্রগণ্য হিসেবে নেতৃত্বের দায়ও অস্বীকার করার উপায় নেই। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও চললো। সেই সময়ে খুবই কম মুসলিম নারী সামাজিক প্রথার গ-ি পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এই অগ্রসরতার নেপথ্যে যাঁর অবদান তিনি স্বামী আব্দুর রইছ। তাঁরই উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় সগৌরবে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সফলতা অর্জন করেন। পাকিস্তান আমল থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের একজন হয়ে জনাব আব্দুর রইছ সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে এলাকার জনগণের সুখ দুঃখের বন্ধু হয়ে তাঁদের সাথে পথ চলতে লাগলেন। পাশে একনিষ্ঠ সহকর্মী রফিকা চৌধুরীও সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। সংসারের সাথে এক কাতারে চললো রাজনীতিও। একজন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, অন্যজন একই জেলার মহিলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ও সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতির সভানেত্রী হিসেবে আমরণ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ছিলেন। আমার বাবাও সুনামগঞ্জ বারের আইনজীবী ছিলেন। জগন্নাথপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন বলে এই পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে আছে আমাদের পরিবারও। বাবা ও চাচা সবসময় একসাথে চলতেন। আমার মা আর চাচী(রফিকা)ও ছিলেন এক আত্মা এক প্রাণ। মায়ের মৃত্যুশয্যায় চাচী ও আরতিদি ছিলেন অতন্দ্র প্রহরীর মত। ২০০৮’র নভেম্বরে আমার স্নেহময়ী শ্রদ্ধেয় মা,২০১৪’র জানুয়ারীতে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা আরতিদি এবং ২০১৪ এর নভেম্বরে আমার শ্রদ্ধেয় চাচীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। মায়ের লোকান্তরের পর ছয়টি বৎসর চাচীর স্নেহ আদরে মায়ের গন্ধ অনুভব করতাম। ২০১৩ ‘র জুন বা জুলাই মাসের কোন একদিন আমাদের বাসায় এসেছিলেন সাথে ছিলেন খালাম্মা সেলিনা রহমান, আমাদের সহপাঠী বন্ধু রুষির মা এবং বরসহ লিজি ও মেয়েসহ রুষি। সারাটা দিন খুব আনন্দে কেটেছে। সবাই মিলে ছবিও উঠানো হল অনেকগুলো।এই-ই নাকি উনার জীবনের শেষ কোথাও বেড়াতে আসা। বাসায় ফিরে আমাদের বাসায় এসে ভাললাগার কথা গল্প করেছেন। সেদিনই আভাস পেয়েছিলাম দুরারোগ্য মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার। পরে লিজির সাথে কথা বলে জনেছি টেষ্ট রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়ার খবর। স্কয়ার হাসপাতালে কেমো নেয়া শুরু হলো, চেষ্টা করতাম সেই সময় পাশে থাকতে, দুইবার ছিলামও যখন কেমো নেন। উনার কথা বলা বা চালচলনে মনেই হয়নি এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিবেন। চিরবিদায়ের খবরটি যখন পাই তখন সংগঠনের উপ-পরিষদ সভা চলছিল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই মনে হয়েছিল কারণ লিজির সাথে প্রতিদিনই ফোনে কথা হত। ওর কাছ থেকে মারাত্মক কোন পূর্বাভাস পাইনি। লিজি ও আমি একই রকম মর্মাহত হয়েছিলাম কারণ সে-ও ঢাকায় ছিল। কেমোতে কিছুটা সুস্থ বোধ করায় প্রাণপ্রিয় সংগঠন সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতির সংস্কার কাজ তদারকিতে ফোনে যোগাযোগে প্রশান্তি পাচ্ছিলেন না বলে সশরীরে সেখানে ছুটে গেলেন। দিন কয়েক ভালই কাটার পর এক রাতে হঠাৎ করেই অসুস্থতা বেড়ে গেলে সিলেটের একটা ক্লিনিকে নিয়ে আসা হলেও বিধি বাম, সেই ক্লিনিকেই নিভে গেলো চাচীর প্রাণ-প্রদীপ। আমাদের আড়ালে রেখে চিরদিনের মত পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন প্রিয় শ্রদ্ধেয় চাচী রফিকা রইছ চৌধুরী। আজ ১১ই নভেম্বর ২০১৬, তাঁর মহাপ্রয়াণের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে অন্তরের অন্তস্থল থেকে জানাই গভীরতম শ্রদ্ধাঞ্জলি।