সু.খবর ডেস্ক
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি শহীদ কাদরী। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল ১১টা ১০ মিনিটে কবির মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্র্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন ও বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে কবি, কবিতানুরাগী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রয়াত কবিকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এর আগে বুধবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় কবির মরদেহ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত খরচে কবি ও তার পরিবারকে দেশে আনা হয়েছে।
ভোরে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে প্রয়াত শহীদ কাদিরর স্ত্রী নীরা কাদরী, কবিপুত্র আদনান কাদরী এবং পারিবারিক বন্ধু সাবিনা হাই উর্বি ঢাকায় পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাদের সঙ্গে কবির মরদেহ গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। এসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ বারিধারায় কবির বড় ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান ছোট ভাইয়ের মুখটি শেষবারের মতো দেখেন শহীদ কাদরীর বড় ভাই। এরপর সেখান থেকে সকাল ১১টা ১০ মিনিটে মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কবিকে নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্র্রীয় মসজিদে। সেখানে নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবিকে অন্তিম শয়ানে শায়িত করা হয়। কবির প্রিয় জায়গা বাংলা একাডেমিতে নেওয়ার কথা থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে তা বাদ দেওয়া হয়।
নিউইয়র্কের নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানীয় সময় রবিবার সকাল ৭টায় কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিডনি-সংক্রান্ত নানা জটিলতায় অনেক দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন কবি শহীদ কাদরী। কিছুদিন আগেই পুরো দুই সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। পরের দিনই আবার ডায়ালাইসিস। হুইলচেয়ারে বসে টেলিফোনে নিজের অসুস্থতা, ক্লান্তি, নিউইয়র্কের জীবন, দেশ ও আড্ডাময় জীবন আর তার আজন্মসঙ্গী কবিতার মানুষের কথা বলেছিলেন কবি। কিন্তু সাত দিন আগে আবার তাকে উচ্চ রক্তচাপ ও জ্বর নিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন প্রেম ও দ্রোহের এই কবি।
শহীদ কাদরীর জন্ম কলকাতায় ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তার পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসে। শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছিলেন কলকাতায় আর মাকে ঢাকায়। আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন তিনি। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ শাণিত রূপ তার কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর ও সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তার কাব্যে। ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’, ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থে অধিকার করে নিয়েছেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম আসন।
১৪ বছর বয়সে শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা ‘এই শীতে’ বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ওই দিনটি ছিল কবির কাছে একই সঙ্গে আনন্দ আর বেদনার। কারণ, কাকতালীয়ভাবে সেদিনই তার মা মারা যান।
১৯৭১ সালে শহীদ কাদরী বিয়ে করেন পিয়ারীকে। তার সঙ্গে ১৯৭৮ সালে পাড়ি দেন জার্মানিতে। পিয়ারীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তিনি নতুন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন তার ভক্ত নীরাকে। তার একমাত্র সন্তান আদনান কাদরী।
কবি শহীদ কাদরী বাংলা সাহিত্যে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন খ্যাতিমান এ কবি।