- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সংকটাপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওর, বিলীন হচ্ছে কান্দা

স্টাফ রিপোর্টার
দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা কেটে হচ্ছে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ। জীববৈচিত্র্যের আঁধার টাঙ্গুয়ার হাওরকে প্রায় বাইশ বছর আগে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ঘোষণা দিলেও এখন সেখানে নামছে দৈত্য দানব এক্সেভেটর মেশিন। এই মেশিন দিয়েই কান্দার মাটি খুবলে নিয়ে ফেলছে ফসল রক্ষা বাঁধে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের জীব বৈচিত্র্য। কাজ হারিয়েছেন হাওর পাড়ের মানুষ।
প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা হাওর, বিল ও নদীরপাড়কে বলা হয় কান্দা। হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় হাওর ও বিলের কান্দা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু তাহিরপুর উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে মাটি দিতে এক্সেভেটর দিয়ে হাওর ও বিলের কান্দা অবাধে কাটা হচ্ছে। এ কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। হুমকিতে পড়েছে টাংগুয়ার হাওরের প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র।
জানা যায়, ২০১৭ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরের বেড়িবাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৫৬ লাখ টাকা। চলতি বছর একই ফসলরক্ষায় বেড়িবাঁধে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি প্রায়। ২০১৮ সালে এ বরাদ্দ ছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। এতে হাওরের বেড়িবাঁেধর দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা বেড়েছে।
২০১৮ সাল থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণে মাটি কাটায় পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এক্সেভেটরের উপর। এর আগে শ্রমিক দিয়ে হাওরের ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধের কাজ করা হতো। এতে হাওরাঞ্চলের হাজারও মানুষের কয়েক মাসের জন্য কর্মসংস্থান হতো। প্রাকৃতিক হাওরে যন্ত্র দানব আসায় তারা কাজ হারিয়েছে। এছাড়াও এই এক্সেভেটর দিয়ে মাটি কাটার কারণে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কাটার প্রবণতা বেড়েছে। বেড়েছে কান্দা কাটার প্রবণতাও। যে সকল বাঁধে একটু দূর থেকে মাটি পরিবহন করা হয় সেখানে ট্রাক্টর ট্রলি ব্যবহার করে বাঁধে মাটি দেওয়া হয়। ট্রাক্টর ট্রলি দিয়ে বাঁধের ওপর মাটি ফেলার কারণে বাঁধের উপর থাকা জলজ বন ও হিজল-করচগাছ ক্ষতি হচ্ছে। বাঁধের ওপর দিয়ে ট্রাক্টর ট্রলি চলাচলের সুবিধার্থে গাছ ও ডাল কাটা পড়ছে। আর প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এ সকল কান্দার মাটি কাটার কারণে জলজ বন ও হিজল-করচগাছের উপযোগী জায়াগা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লিখিতভাবে টাঙ্গুয়ার হাওরে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ প্রকল্প না থাকলেও বর্ধিত গুরমা নামে ২৯টি ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ আছে। এই ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে ২০টি প্রকল্পই টাঙ্গুয়ার হাওরের ভেতর দিয়ে বা পাশ দিয়ে করা হয়েছে। আর এ সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি নেওয়া হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা কেটে। ফসলরক্ষা বাঁধ দিতে অন্যান্য হাওরের কান্দাও কাটা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষায় ৬৮ টি প্রকল্পের মাধ্যম ৫৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের সংস্কার চলছে। হাওরের ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধ দেওয়া হয় সাধারণত কান্দার উপর। তবে সব কান্দায় বেড়িবাঁধ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বেড়িবাঁধের এই কান্দাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আফর’। যে সকল কান্দায় বেড়িবাঁধ প্রকল্প আছে এমন অধিকাংশ কান্দার গোড়া থেকে এক্সেভেটর মাটি তুলে ওই বেড়িবাঁধে দেওয়া হয়। আবার যে সকল কান্দা বেড়িবাঁধের আওতায় নেই, সেখানকার মাটি এক্সেভেটর দিয়ে কেটে বাঁেধ দেওয়া হয়। টাংগুয়ার হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কোন প্রকল্প নেই। তবে বর্ধিত গুরমা ফসল রক্ষা বাঁধ নামে ২৯টি প্রকল্প রয়েছে। এসকল বেড়িবাঁধ সংস্কার ও পুণঃনির্মাণে কাটা পড়ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা।
হাওর সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দাকে ঘিরেই হেমন্তে ও বর্ষায় মাছ, পাখি ও প্রাণীর খাদ্যজুটে। তাছাড়া মাছ, পাখি ও প্রাণীর আবাসস্থল এবং অভয়ারণ্য তৈরী হয় এই কান্দাকে ঘিরেই। হাওরের জীববৈচিত্র ও বাস্তুসংসস্থান রক্ষায় কান্দাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। বর্ষার ৬ মাস হাওর ও বিলের কান্দা পানিতে ডুবে থাকে। এক সময় টাঙ্গুয়ার হাওরের বিলগুলো ভরে ছিল নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে। আর কান্দাগুলো ঢেকে ছিল জলজ বন ও হিজল-করচে। মানুষের অধিক আহরণে বিলে এখন মাছ নেই, কান্দায়ও নেই জলজ বন। প্রতি বছরই দা-করাতে কাটা পড়ছে হিজল-করচগাছও। আর এখন ফসলরক্ষা বাঁধের নামে বিলীন হতে চলেছে টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা। ২০১৮ সাল থেকে ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য টাঙ্গুয়াসহ সকল হাওরের স্থায়ী কান্দা কাটা বেড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে হাওরের বাস্তুসংস্থানেও।
টাঙ্গুয়ার হাওরের ৩৭ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত টাংগুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়াস টাওয়ার সংলগ্ন জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা আহমেদ কবীর বলেন, ৪ বছর ধরে ফসল রক্ষা বাঁধে বরাদ্দ বেড়েছে কয়েকগুণ। বেড়িবাঁধে মাটির দেওয়ার পরিমাণও বেড়েছে কয়েকগুণ। এ সকল মাটির জন্য পিআইসি কাটছে হাওরের কান্দা। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা। আমাদের চোখের সামনেই এমনটি হচ্ছে। দেখে কষ্ট পাচ্ছি, খারাপ লাগছে কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পার্শ^বর্তী পাঠাবুকা গ্রামের বাসিন্দা রিপচান হাবীব বলেন, প্রতিটি হাওরেই কান্দা কাটা হচ্ছে। তবে বর্ধিত গুরমার ফসলরক্ষা বাঁধে মাটির জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের কান্দা। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাটিয়ান হাওরের কান্দাও।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মন্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সানজু মিয়া বলেন, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কান্দার মাটি কেটে ভবিৎষতের জন্য ঝুঁকিতে ফেলছে হাওরের ফসলরক্ষার স্থায়ী বাঁধকে। হাওরের ফসলরক্ষায় আমরা চাই শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব কাজ। মাটি কাটায় যন্ত্রদানব বিপন্ন করছে হাওরের গাছ ও মাটিকে। ২-১ বছরের মধ্যেই বাঁধে মাটি দেওয়ার জন্য উঁচু জায়গা খুঁজে পাবে না।
টাঙ্গুয়ার হাওরসহ পাশর্^বর্তী হাওরে এক সময় বাঁধের কাজ করেছে পরিবেশবাদী সংস্থা সিএনআরএস (সেন্টার ফর নেচারাল রিসোর্স স্টাডিজ)। সংস্থাটির সুনামগঞ্জ জেলা মুখপাত্র ইয়াহিয়া সাজ্জাদ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে যন্ত্র দিয়ে যেভাবে কান্দা কাটা হচ্ছে তা খুবই বিপদজনক। টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোনভাবেই কান্দা কাটা যাবে না। প্রয়োজনে শ্রমিক দিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা শ্রমিক দিয়ে জমি থেকে মাটি উত্তোলন করে বাঁধ দিয়েছিলাম।
প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্রের আঁধার। হাওরটির কান্দাকে ঘিরেই হেমন্তে ও বর্ষায় মাছ, পাখি ও প্রাণীর অভয়ারণ্য তৈরী হয়। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক কান্দা কাটার কারণে উদ্ভিদ, জলজ বন নিশ্চিহৃ হবে। মাছ ও প্রাণীর খাদ্য, আবাস্থল নষ্ট হবে। এর বিরুপ প্রভাব পড়বে হাওরের বাস্তুসংস্থানে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তাহিরপুর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপ-সহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, প্রকল্প এলাকায় মাটির প্রয়োজনেই কান্দা কেটে ফসলরক্ষা বাঁধে মাটি দেওয়া হয়। আমি এ বছর যোগদান করেই এ ব্যাপারে সতর্ক করেছি। কান্দা কাটার কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় কান্দা কাটা হচ্ছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিৎষতে ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য মাটি পাওয়া যাবে না বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন।

  • [১]