- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সংকটে মালয়েশিয়ার রাজনীতি ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোটে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে

শেখ কবির আহমেদ, মালয়েশিয়া
পূর্ব এশিয়ার পর্যটন নগরি আধুনিক মালয়েশিয়া রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধীজোটে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে। ওয়ানএমডিবি বিতর্কে বেশ বেকায়দায় আছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। অনেকে এ বিতর্কেই তার রাজনীতির ইতি দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু নাজিব রাজাকই নন, রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে পুরো মালয়েশিয়াই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় নাজিবের আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকাকালে এভাবে কোনো বিতর্কে জড়িয়ে পড়েননি। কোনো প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভে উত্তালও হয়নি দেশ। কিন্তু এবার হয়েছে। গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানী কুয়ালালামপুরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয় নাজিববিরোধী জোট বার্সিহ। এরই ধারায় ২৯ ও ৩০ আগস্ট মারদেকা অভিমুখে র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে যোগ দেন লক্ষাধিক মানুষ।
সমালোচকরা বলছেন, এবার সত্যিই বেশ চাপে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারওপর এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ড. মাহাথির মোহাম্মদ রাজপথে নামায় নাজিবের অবস্থান আরও নাজুক হয়ে পড়েছে ।
দেশটির বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় সরকারের ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোট, উভয় জোটেই দিনে দিনে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে। তাদের মতে, এ দ্বন্দ্বের চরম প্রকাশ ঘটতে পারে ২০১৮ সালের নির্বাচনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত ২০১৩ সালের নির্বাচন থেকে। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর এখন পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় আছে ইউএনএমও। এর আগে কখনও জনপ্রিয়তায় ভাটা না দেখলেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে দলটিকে তা দেখতে হয়।
নির্বাচনের পরপরই দলের মধ্যে শুরু হয় গুঞ্জন। দলের কোনো কোনো সদস্য মনে করেন, নাজিব রাজাকের পরিকল্পনায় ও পদক্ষেপে ত্রুটি থাকাতেই এমন দিন দেখতে হচ্ছে তাদের। অনেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধীজোটের কাছে হেরে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন।
এই গুঞ্জন চলার মাঝেই গত বছর জুলাই মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এতে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওয়ানএমডিবি ফান্ড থেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন রিংগিত (৫ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা) জমা করা হয়েছে। এরপর থেকেই ইউএনএমও-তে নাজিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেন অনেক নেতা। অবস্থা বেগতিক দেখে মন্ত্রিপরিষদ রদবদলের নামে গত বছরের ২৮ জুলাই তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিন ইয়াসিনকে বরখাস্ত করেন। তার এ পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয় দলে। কারণ মুহিদ্দিন ইয়াসিন ইউএনএমও’র ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি দলের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন। নাজিবের উত্তরসূরি মনে করা হতো তাকে।
এ দিকে  মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব বিন রাজ্জাকের পদত্যাগ চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় নিয়ে নাজিবকে পদত্যাগ করা উচিত এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চায় না দেশের মানুষ-বললেন মাহাথির।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ, এনজিও নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজের শীর্ষ পঞ্চাশজন ব্যক্তিত্ব। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গতবছর নাজিব সরকার থেকে বাদ পড়া সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দীন ইয়াসিন, সেলাংগর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী দাতুক শ্রী আজমিন আলী , কেডাহ প্রদেশের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মুখরিয মাহাথির,বিরোধী রাজনৈতিক দল পাস এর দাতুক মোস্তাফা আলী, এমসিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট তুন ড. লিং লিয়ং সিক, ডিএপি এডভাইজার লিম কিট সিয়াং, এনজিও নেতা মোহাম্মদ সাবু, দাতুন জাইদ ইব্রাহিম প্রমূখ। মোট পঞ্চাশ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ নাজিব হটাও, মালয়েশিয়া সুরক্ষা কর শ্লোগানে নাগরিক কমিটির ঘোষনা পত্রে সাক্ষর করেন। ৪ মার্চ স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটায় ইউনিভার্সিটি মালায়ায় একটি ক্লাবে এই সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। খবর মালয়েশিয়ার ইংরেজি দৈনিক দি স্টার ও এনএসটি অনলাইন সংস্করণের।
অন্য এক খবরে দেশটির সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তুন ড: মাহাথিরকে সমর্থন জানিয়েছেন। ৩ মার্চ বৃহস্পতিবার জেল থেকে এক বার্তায় এই সমর্থন ব্যক্ত করেন। এ দিকে ৪মার্চ আরেকটি অনুষ্ঠানে নাজিব সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী আহমদ হামিদি বলেছেন, নাজিব গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। নাজিবের পদত্যাগ দাবি করা অবৈধ ও সংবিধান বিরোধী।
এদিকে, নাজিবের সবচেয়ে বড় সমালোচক মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে প্রকাশ্যে মুহিদ্দিন ও অন্যান্য নেতারা যোগ দেয়ায়  পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে বলে  বিশ্লেষকদের ধারনা। মালয়েশিয়ায় যে ঘটনার নজির নেই, সে ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। নাজিবের কট্টোর অবস্থানের কারণে ভেঙেও যেতে পারে ইউএনএমও। এর পেছনে শক্ত যুক্তিও পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ৩১ আগস্ট মালয়েশিয়ার জাতীয় দিবসে স্থানীয় সময় সকালের ভাষণেই নাজিব বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ তো করবেনই না, উপরন্তু কঠোর হাতে আন্দোলন দমন করবেন।
এর পরপরই খবরে জানা যায়, বার্সিহ আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাজিবের বিরুদ্ধে ড. মাহাথির মোহাম্মদ যে অভিযোগ তুলেছেন, তা ব্যাখ্যা করতে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হয়েছেন মাহাথির। এতে সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ জনগণের মধ্যে আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথিরের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
এসব ঘটনায় মাহাথির-মুহিদ্দিনসহ ইউএনএমও’র যে নেতারা নাজিবের ওপর নাখোশ, তারা যদি দল ভেঙে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়ে বসেন, তাহলে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে রীতিমত বিস্ফোরণ ঘটবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম পরবর্তীতে ইউএনএমও থেকে বেরিয়ে পিপল’স জাস্টিস পার্টি (পিকেআর) গঠন করেন। এরপর বাকি দুই বিরোধী দল প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (পিএএস) ও ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টিকে (ডিএপি) নিয়ে তিনি বিরোধী জোট পাকাতান রাকায়েত (পিআর) গঠন করেন। কিন্তু পুরুষকামীতার কারণে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জেল হয় আনোয়ার ইব্রাহিমের। তার এ অনুপস্থিতিতে ধীরে ধীরে বন্ধন হাল্কা হতে শুরু করেছে জোটে। পিএএস ও ডিএপি’র আদর্শগত পার্থক্যকে এর মূল কারণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। পিএএস মালয়েশিয়ার একটি ইসলামিক রাজনৈতিক দল, আর ডিএপি হলো মধ্য-বামপন্থি দল। এই আদর্শগত পার্থক্যের কারণে দল দু’টোর মধ্যে সম্পর্কে শীতলতা নেমে এসেছে। এর ফলে কার্যত বিরোধী জোট পাকাতান রাকায়েত বলতে গেলে নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ডিএপি ও আনোয়ার ইব্রাহিমের পিকেআর জোটের অপর শরিক পিএএসকে বাদ দিয়েই জোট গঠনের চেষ্টা করছে। এর ফলে নাজিবের ইউএনএমও’র সঙ্গে পিএএস’র ভিড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আগামীর মালয়েশিয়া হয়তো মালয়-মুসলিম রাজনৈতিক জোটের সরকার দেখতে চলেছে।
তবে এ সম্ভাবনা শুধু কাগজ-কলমের হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। কারণ পিএএস একটি রক্ষণশীল দল। দলটি এরই মধ্যে জোট সরকার গড়ায় ইউএনএমও’র সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারটি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ার রাজনীতি এমন এক অধ্যায়ে ঢুকতে চলেছে, যার বর্ণনা শুধু ভবিষ্যতই দিতে পারবে।
ক্ষমতাসীন দলে কিংবা বিরোধী জোটে দ্বন্দ্বগুলো এমন এক সময় চলছে, যখন পরবর্তী নির্বাচন থেকে মালয়েশিয়া মাত্র দুই বছর দূরে রয়েছে। আপাতদৃষ্টে এ সময় অনেক বড় বলে মনে হলেও সংকটের বিচারে তা খুবই কম। প্রশ্নটা উঠছে, ক্ষমতাসীনরা বা বিরোধীরা কি এই সময়ের মধ্যে নিজেদের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে? যদি পারে, তাহলে হয়তো এ সংকটকে সাময়িক বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি না পারে, তাহলে মনে রাখতে হবে, ২০২০ সালের টার্গেট থেকে মাত্র চার বছর পেছনে আছে মালয়েশিয়া। দেশটির রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে যাই ঘটুক, তাতে বর্তমানে রাজনীতিতে চলমান দ্বন্দ্বই যে মুখ্য ভূমিকা রাখবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে এ রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে মালয়েশিয়া তার সামনে এগিয়ে যাওয়াটা কি ধরে রাখতে পারবে?

  • [১]