- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সংগ্রামের শেষ প্রহরে নতুন অগ্নি শপথ

সৈয়দ নজরুল ইসলাম
আমার প্রিয় দেশবাসী ভাই বোনেরা,
ঝঞ্ঝা সঙ্কুল, সংগ্রামময়, অমারাত্রির শেষতম প্রহর আমরা অতিক্রম করে এসেছি। স্বাধীনতার সূর্যাভাসে বাংলাদেশের দিকবিদিক আজ উদ্ভাসিত। স্বাধীনতার এই সূর্যসকালে আপনার আমার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পাতায় লিখিত হল আর একটি স্মরণোজ্জল দিন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক ন্যায্য স্বীকৃতি দিয়েছেন আমাদের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষ। বাংলা-দেশের মাটিতে যে নির্মমতম গণহত্যা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত করার জন্য মহান ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই দীর্ঘ আট মাস ব্যাপী যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তার জন্য আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের তরফ থেকে তাঁকে ও ভারতবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
মিত্র রাষ্ট্র ভারতের সৈন্য বাহিনীর জোয়ানরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার শত্রুদেরকে নির্মূল করার জন্য আজ যুদ্ধ করে চলেছেন। আর এই ভাবেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে অটুট বন্ধন রচিত হচ্ছে তা রক্ত দিয়ে লেখা। মিত্র রাষ্ট্র ভারতের জোয়ানদেরকে আমি বাংলাদেশের জনগণের তরফ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
প্রায় সাড়ে আট মাস হ’তে চললো, আমরা এ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এসেছি। এই সংগ্রামের ইতিহাস, জয়ের ইতিহাস, শত্রুকে উপর্যুপরি আঘাত হানার ইতিহাস, বাঙ্গালীর শৌর্যবীর্যের ইতিহাস, শত্রুদের পর্যায়ক্রমে পরাজয়ের ইতিহাস। এ ইতিহাস যাঁরা লিখেছেন, বাংলার সেই কোটি কোটি জনসাধারণ, যাঁদের ত্যাগ ও তিতিক্ষা এ ইতিহাস লেখায় সাহায্য করেছে, তাঁদের সবাইকে আমি সংগ্রামী সালাম জানাই। বাংলার বীর সন্তানেরা যাঁরা অস্ত্রধারণ করে হানাদার দস্যুকে আঘাত হেনেছেন, সেই মুক্তিবাহিনীর, বীর সৈনিকদেরকে আমি আজকের দিনে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
আজকের দিনে স্মরণ করি, সেই সমস্ত বীর শহীদদেরকে যাদের রক্তে বাংলার শ্যামল প্রান্তর লাল হয়েছে, আর য়াঁদের বীরত্বের ইতিহাস বাঙ্গালী জাতির জন্য এক গৌরবময় অধ্যায় রচনা করে গিয়েছে।
বন্ধুরা আমার, রক্তের আখরে লেখা, এই সংগ্রামের ইতিহাসের সাফল্যের এ ক্রান্তি লগ্নে আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, বাঙ্গালী জাতি পিতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্বাধীনতার এ ঊষা লগ্নে আজ তিনি আমাদের মধ্যে উপস্থিত নেই। বর্বর জঙ্গীশাহীর কারাগারে আজ তিনি আবদ্ধ। আমরা জানিনা, অন্ধকার কারাগারে কি দু:সহ জীবন তিনি যাপন করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের বীর মুক্তি বাহিনী, আমরা সবাই যাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত, আর যাঁর আদর্শকে রূপ দেওয়ার জন্য আজকের এ সংগ্রাম চলছে এবং চলবেÑ সেই মহান নেতাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা চেষ্টা করছি এবং করে যাবো। যে হানাদার দস্যুরা বাংলার নয়নমনিকে বারাগারে আজও আবদ্ধ করে রেখেছেন, তাঁদের কাছে আমি বলতে চাই, সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর দুর্জয় সাহস আর প্রতিজ্ঞা, যেমন অন্ত্রের ভাষায় রুদ্ধ করা যায়নি, তেমনি করে বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে কারাগারে রেখেও তাঁরা নিস্তার পাবেন না।
প্রিয় দেশবাসীর কাছে আমি, আমার সরকারের তরফ থেকে আশ্বাস দিচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য চেষ্টা করছি, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবো। কেননা আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুকে পেলত না পেলে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করা সম্ভবপর হবে না।
বন্ধুরা আমার, আজকের এই দিনে, ভারতবর্ষ যখন আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়ে সারা পৃথিবীর সামনে সাড়ে সাতকোটি মানুষের ইচ্ছাকে পূরণ করেছে, সেই দিনে আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে আবেদন করব, আপনারা স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলঅদেশের সত্ত্বাকে স্বীকার করে নিন। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের যে মূল্যবোধ যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে মানুষের অগ্রগতিকে সাহায্য করেছে, সেই স্বাধীনতার ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধে যদি কারো কোন আস্থা থাকে, আজকে তাঁদের কাছে আমার উদাত্ত আহবান, দ্বিধা না করে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার মর্যাদাকে রক্ষা করুন।
বন্ধুরা আমার, আমার বিশ্বাস, ভারতবর্ষের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, অচিরেই পৃথিবীর আরও দেশ আমাদেরকে স্বীকৃতি দিবেন। পৃথিবীর যে সমস্ত বৃহৎ রাষ্ট্র আজকে রাজনীীতর আর জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে বাস্তব সত্যকে স্বীকার করে নিতে পারছেন না, তাদের ভূমিকা ভবিষ্যৎ কালের বংশধরেরা কোন দিনই ভুলবে না। পৃথিবীর সকল দেশের শান্তিকামী মানুষের জন্য আমার দেশের জনগণের ভালোবাসার কথা আমি আবার ঘোষণা করছি। কিন্তু যাঁরা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আজকে ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বানচাল করার জন্য এখনও ক্ষীণ ও দুর্বল প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, সে সমস্ত রাষ্ট্র আজও একজন অত্যাচারী ক্ষয়িষ্ণু একনায়ককে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছেনÑসেই সমস্ত বৃহৎ রাষ্ট্রের কাছে আমি এখনও আবেদন করব, আপনারা আপনাদের নীতি পরিবর্তন করুন, বাস্তবকে স্বীকার করে নিন। স্বাধীন বাংলাদেশের সত্ত্বাকে আপনারা উপেক্ষা করতে পারেন নাই ভাবিষ্যতেৎ পারবেন না।
বন্ধুরা আমার, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, আজকে হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্নঅঞ্চল থেকে হ’ঠে যাচ্ছে, আমাদের মিত্র বাহিনীর সহায়তায়, মুক্তিবাহিনীর জোয়ানেরা মুক্তিবাহিনীর নৌ-বিভাগের দুর্ধর্ষ নাবিকেরা, মুক্তিবাহিনীর অসম সাহসী বৈমানিকেরা, আজকে শত্রুকে আঘাত হানতে হানতে পিছু হঠিয়ৈ দিচ্ছেন। শুধু মাত্র কয়েকটি বড় বড় ক্যান্টনমেন্টে আজকে তারা আবদ্ধ।
প্রিয় দেশবাসী ভাইয়েরা, আপনারা বিশ্বাস করুন, আর বেশী বেশী দেরী নাই, যে দিন মিত্রবাহিনীর সহায়তায় আপনাদের মুক্তিবাহিনী ইয়াহিয়া খানের নৃশংস সৈন্যবাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে সমূলে উৎখাত করবে।
তাই আমি দেশবাসীর কাছে আবেদন করব, শেষ আর চরম আঘাত হানার জন্য আমাদের মুক্তিবাহিনী, আমাদের মিত্রবাহিনীর সহায়তায় জোর কদমে এগিয়ে চলেছে, তখন আপনারা তাঁদের প্রতি যে সহানুভূতি, সাহায্য বিগত সাড়ে আট মাস দেখিয়েছেন, সেই সহানুভূতি এবং সাহায্য দিয়ে বিজয়ের মুহূর্তটিকে ত্বরান্বিত করুন।
 বন্ধুরা আমার, অচিরেই সারা বাংলাদেশ জুড়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শাসন ব্যবস্থা কায়েম হতে চলেছে। দীর্ঘ তেইশ বছরের ঐপনিবেশিক শাসন এবং গত আট মাসে শত্রুদের নির্বিচার স্বেচ্ছাচারিতার ফলে বাংলাদেশের শাসন কাঠামো ও অর্থনৈতিক অবস্থা সাংঘাতিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। এর অপরিহার্য পুনর্গছনের দায়িত্ব আমাদের সকলের উপর রয়েছে। বিপর্যস্ত দলের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা পুনবিন্যাসের দায়িত্ব আমার সরকারের সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসী সবাইকে নিতে হবে। যে অটুট মনোবল ও অতুলনীয় বীরত্ব দিয়ে দেশকে আপনারা শত্রুমুক্ত করে চলেছেন ইতিহাসে তা অনন্য ঘটনা হিসেবে স্থান পাবে। সেই মনোবল এবং উদ্যমকে এখন দেশ গঠনের কাজে নিয়োগ করতে হবে। অন্য দিকে তেমনি স্বর্ণপ্রসবিনী বাংলার হৃত সৌন্দর্য ও সম্পদের পুনরুদ্ধারের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে  আমার সরকারের মৌলিক নীতি ইতিপূর্বেই ঘোষণা করা হয়েছ্ েধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র আর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলা গঠন করতে হবে।
স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষে মানুষে কোন প্রভেদ থাকবে না, ধর্মে ধর্মে কোন প্রভেদ থাকবে না। তিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, যে যে ধর্মেরই হোন না কেন, তাঁদের ব্যক্তিগত আর সামাজিক জীবনে পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। রাষ্ট্রীয় জীবনে গণতন্ত্রের মূল আদর্শের উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের সুখী আর সমৃদ্ধশালী বাংলা আমরা গড়ে তুলব।
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের ম্যেলিক অধিকার স্বীকৃত হবে। প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হবে।
জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই বাংলাদেশের স্থায়ীত্ব, স্বাধীনতা আর অগ্রগতির স্বাধীনতা গ্রহণ করবে।
বন্ধুরা আমার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের মূল লক্ষ্য। তাই দেশবাসী ভাইদের কাছে আমি আদেন করছি, সরকারের তরফ থেকে আইনের শাসন প্রবর্তন করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সোনার বাংলার শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য সরকার পে পদক্ষেপ গুলি নিবেন, আপনারা এই পদক্ষেপে সরকারকে সাহায্য এবং সহযোগিতা করবেন।
দেশবাসী ভাইদের কাছে আমি আরও আবেদন করব, নিজের হাতে আপনারা আইনের ভার তুলে নিবেন না। আপনারা শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিজ নিজ এলাকায় নিজের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। মুক্তিবাহিনীর বীর সৈনিকেরা এবং আমার সরকারের নিয়োজিত কর্মচারীরা আপনাদেরকে পরিপূর্ণভাবে সাহায্য করবে।
বন্ধুরা আমার, তেইশ বছরের শোষণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা। বাংলার সম্পদকে লুন্ঠন করে তেইশ বছরে সোনার বাংলাকে তারা শাসন করেছে। নৃশংস সেনাবাহিনী আমাদের অর্থনীতির মেরুদন্ড, অনেক শিল্প কারখানাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিপর্যস্ত এ অর্থনীতিকে সম্বল করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার াংলাদেশের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আর মুক্তির শপথ নিয়েছে। আমার সরকারের তরফ থেকে আমি বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করতে চাই যে, একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর সকল স্তরের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাবো। আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করব, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধনী দরিদ্রের ব্যবধান দূর হবে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রতিটি কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত মানুষ তার জীবন ধারণের পরিপূর্ণ সুযোগ পাবে।
কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের কোর সরকারের পক্ষেই কোন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কার্যকরী করা সম্ভবপর হয় না যদি না দেশবাসীর পরিপূর্ণ সমর্থন পাওয়া যায়।
আমার সরকার অচিরেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলি দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করবেন। আমি দেশবাসী ভাইদের কাছে আবেদন জানাই, সরকারের এই প্রচেষ্টায় আপনারা পরিপূর্ণভাবে সাহায্য আর সহযোগিতা করবেন।
বন্ধুরা, বহু দু:খ, বহু কষ্ট আমরা করেছি। বহু রক্ত আমরা দিয়েছি, বহু মায়ের বুক খালি হয়েছে, বাংলার বহু নারী তার ইজ্জ্বত খুইয়েছে স্বাধীনতাকে অর্জন করার জন্য। সে স্বাধীনতা আজকে অর্জিত হতে চলেছে, সেই স্বাধীনতাকে স্থায়ীভাবে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য ফলপ্রসু করার মহান দায়িত্ব দেশবাসী সবাইকে নিতে হবে।
তাই দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, স্বাধীনতার সংগ্রাম সমাপ্তি হলেই আপনার আমার সংগ্রামের সমাপ্তি হবে এ যেন আপনারা না ভাবেন। দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতোই দৃঢ় মনোবল নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
নতুন সংগ্রামের আহবান
প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এই আহবান আজকে আপি আপনাদেরকে জানাচ্ছি। আমি আশা করি স্বাধীনতার সংগ্রামে যে ভাবে আপনারা বিপুলভাবে সাড়া দিয়েছেন, আগামী দিনের সুখীসমৃদ্ধশালী বাংলা গঠনের সয়গ্রামে তেমনি ভাবেই আপনারা সাড়া দেবেন। আমরা যে সমস্ত প্রিয় দেশবাসী নৃশংস হানাদার সৈন্যদ্বারা বিতাড়িত হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের কাছে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই।
ইতিহাসের নজীরবিহীন এই দুর্বিপাকের মোকাবিলা করেছেন, আপনারা দুর্নিবার সাহস ও তিতিক্ষার সাথে। এর জন্য শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বের সহানুভূতি আপনাদের জন্য আজ উন্মুক্ত।
আমি স্থির বিশ্বাসী যে আপনাদের দু:খের দীর্ঘ রাত্রি প্রায় ফুরিয়ে এল, অতি শীঘ্রই আপনারা আপনাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে সসম্মানে ফিরে আসতে পারবেন। বাংলাদেশ সরকার আপনাদের নিরাপদে দেশে ফিরে আসা ও পুনর্বাসনের সব দায় দায়িত্ব সানন্দে নিয়েছেন।  
প্রিয় দেশবাসী ভাইয়েরা, আজকের এই দিনে আপনাদের তরফ থেকে সারা পৃথিবীর ছোট বড় সকল রাষ্ট্রকে আমি জানিয়ে দিতে চাই যে, আমার সরকারের পররাষ্ট্র নীতি হবে, জোট নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি। এই জোট নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির মাধ্যমে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমরা সহ অবস্থানের নীতিতে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাই।
আমরা সকল প্রকার সা¤্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশবাদের বিরোধী। পৃথিবীর যেখানেই মানুষ গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করবে, আমরা সেই সমস্ত সংগ্রামী মানুষকে সমর্থন ও সহযোগিতা করব।
প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা,এই মহান আদর্শকে রূপ দেওয়ার জন্য আপনাদের আজ এই চরম লগ্নে নুতন করে অগ্নি শপথ নিতে হবে। বীর মুক্তিবাহিনীর জোয়ানরা, বাংলার সাহসী ছাত্র এবং তরুণেরা, দেশমাতৃকাকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য তোমরা বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম করেছ।
শত্রুর উপর শেষ আঘাত
বীর মুক্তিবাহিনীর ভাইয়েরা, সংগ্রামের এই শেষ মুহূর্তে তোমাদের কাছে আমি উদাত্ত আহবান জানাব, জোর কদমে তোমরা এগিয়ে চলো। আমাদের মিত্র বাহিনীর ভাইয়েরা, আমাদের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তাদের বুকের তাজা রক্ত বাংলার ম্যামল মাটিতে ঢেলে দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর শেষ দুর্গগুলোর উপর প্রচ- আঘাত হানতে হবে। আঘাতের পর আঘাত করে শত্রুর দুর্গগুলিকে চুর্ণ করে দাও।
আজকে তোমাদের একটি দুর্জয় শপথ হোক। সেই শপথ ‘ঢাকা চলো’। ঢাকার বুকে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা উড্ডীন করো।
আমি আল্লাহতালার কাছে মোনাজাত করছি। বাংলার দুর্জয় বীরেরা তোমাদের চরম সাফল্য নিকটবর্তী হোক।
প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, সংগ্রামের এই শেষ মুহূর্তে আপনারা ও মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেষ চেষ্টায় শরিক হোন। আপনাদের কাছে এই আমার আকুল আবেদন। ইনশাল্লাহ, আমাদের সুনিশ্চিত সাফল্য আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি।
আল্লার মেহেরবানীতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঢাকার বুকে প্রতিষ্ঠিত হবে। বাঙ্গালী জাতির মহান পিতা শেক মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন সফল হবে।
শেখ মুজিবুর রহমান –  জিন্দাবাদ
বাংলার সংগ্রামী জনতা – জিন্দাবাদ
বাংলার মুক্তিবাহিনী – জিন্দাবাদ
{ (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম কর্তৃক জাতির উদ্দেশ্যে ৭ই ডিসেম্বরে প্রদত্ত বেতার ভাষণ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দফতরের পক্ষ থেকে এম.আর আখতার কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত}

  • [১]