- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সংস্কৃতিকে বদ্ধ শীতল ঘর থেকে বের করে আনতে হবে

লোকসংস্কৃতিকে একটি জাতির প্রাণ বলা যেতে পারে। প্রাণ ছাড়া দেহটি যেমন অসার এক আকৃতি মাত্র তেমনি লোক-সংস্কৃতি বাদ দিয়ে কোনো জাতির চেতনা সম্পর্কে এতটুকু ধারণা পাওয়া যায় না। জাতির আদি ও অকৃত্রিম রূপ খোঁজে পাওয়া যায় তাঁর লোক-সংস্কৃতির ভাজে ভাজে। তাই সকল জাতি নিজের ঐতিহ্য প্রাণরূপ লোক-সংস্কৃতিকে নিয়ে সবচাইতে বেশি গর্ব করে, শত শত বছর পরেও এর পরতে পরতে লোকানো মনিমানিক্য সন্ধানে নিয়োজিত থাকে। বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণও লুকিয়ে আছে এর হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতির ভা-ারে। লোকশিল্পীরা গানে কথায় কেচ্ছায় কারুকাজে পটে বিন্দু বিন্দু করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন যুগে যুগে। এইসব নমুনাই যমুনা হয়ে তৈরি করেছে মহিমান্বিত বাঙালি সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি উদারতা শেখায়, সহিষ্ণুতা শেখায়, ভালোবাসা শেখায়। এই উদারতা, সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসা মিলে তৈরি করে অগ্রগতির পলি-বওয়া স্রোতস্বিনী নদী। আমাদের হাওরের সুনামগঞ্জ লোক-সংস্কৃতির এমন এক খনি যেখানে দিকে দিকে রতœরাজি। শত শত লোকশিল্পী নিভৃতে মনের আনন্দে তৈরি করেছেন কত হাজার গান তার হিসাব রাখা কঠিন। কত হারিয়ে গেছে। কিছু যা রয়েছে তাই বিশ^ময় সুনামগঞ্জের সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছে। যেখানেই বাঙালি যেখানেই বাংলা ভাষা সেখানেই রাধারমণ, হাছনরাজা, শাহ আব্দুল করিম। এইসব মনিষীর চর্চা আমাদের সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধকর করে তুলেছে। সুতরাং লোকসংস্কৃতির উর্বর এই জনপদ নিয়ে সংস্কৃতিজন মাত্রই ভীষণভাবে আন্দোলিত হন, আলোড়িত হন, আগ্রহী হন।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ শনিবার এসেছিলেন সুনামগঞ্জ। গিয়েছিলেন রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিমের জন্মস্থানে। জেলা শহরে করেছেন মতবিনিময়। রাধারমণ দত্তের পৈত্রিক ভিটার বেদখল ভূমির কিয়দংশ উদ্ধারের উল্লেখ করে তিনি বাকি ভূমি উদ্ধার করার আশা দিয়েছেন। এই ভিটায় রাধারমণ কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রী। দিরাই গিয়ে শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতি রক্ষার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও বলেছেন তিনি। সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষে তাঁর এইসব প্রতিশ্রুতি জাতির মননশীলতা তৈরির জায়গায় অনুপম ভূুমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। সংস্কৃতি চর্চা কেবল মাত্র সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়েই দেশ ও জাতি প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে বিশ^সভায় নিজের পরিচয় ও বিকাশের ইতিহাস তোলে ধরতে পারে। আমরা আজ যে ধরনের নেতিবাচক পরিচয় দ্বারা বিশেষায়িত হচ্ছি সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ভা-ারের দিকেই হাত বাড়াতে হবে। জাতি গঠনের এই জায়গায় সংস্কৃতি চর্চার প্রসারে মন্ত্রীর কর্মসূচিগুলো দ্রুত আলোর মুখ দেখুক এই আমাদের কামনা।
কমপ্লেক্স, কেন্দ্র ইত্যাদি নির্মাণের নামে কেবল কংক্রিট নির্মিত কয়েকটি ভবন আর কিছু আমলা বুঝায় না। এর ভিতর সংস্কৃতির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গবেষণা, অনুসন্ধান, চর্চা, অংশগ্রহণ, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা; সবকিছু মিলিয়ে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে তাহলেই কেবল আমরা পেতে পারি কাক্সিক্ষত সুফল। আর একটি কথা, হাওর-ভাটির সুনামগঞ্জে রাধারমণ, হাছন, করিম ছাড়াও রয়েছেন শত শত লোকশিল্পী। এঁদের সকলকেই এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। গ্রামের নিভৃত কোণে বসে আপন মনে যে শিল্পীরা আজও ধরে আছেন ওই মহাকালের সংস্কৃতির সুতো তাঁদেরও পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসার জন্য চাই জোরালো কর্মপরিকল্পনা। সংস্কৃতিকে বদ্ধ শীতল ঘর থেকে বের করে আনতে হবে উন্মুক্ত প্রান্তরে। সংস্কৃতি আবদ্ধ থাকার মতো কোনো বিষয় নয়। এর চর্চা হবে সড়কে, শহীদ মিনারে, হাটের তেমাথায়, বাড়ির উঠোনে, গ্রামের গাছতলায়, মাঠে; তবেই তো সকলে আস্বাদন করার সুযোগ পাবেন এই প্রাণরসের সঞ্জিবনী সুধা। গণমানুষের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় যে সংস্কৃতি তার বিকাশের জন্য চাই আকাশের চাঁদোয়া, লক্ষ মানুষের ছুঁয়া, প্রান্তরের অসীম পরশ।

  • [১]