- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সকল আলোচনা জয়া নাছিরকে ঘিরেই

বিশেষ প্রতিনিধি ও আবু হানিফ
সুনামগঞ্জের আলোচিত নির্বাচনী আসন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লায়)’এ ৭৫ বছর বয়সি দুই হেভিওয়েট আওয়ামী লীগের ড. জয়া সেন গুপ্তা ও বিএনপির নাছির উদ্দিন চৌধুরী সমানতালে গণসংযোগ করছেন। প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এই আসনে ৮ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সবকটি নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে দ্বিমুখী। এবারও মূল আলোচনায় ড. জয়া সেন গুপ্তা ও নাছির উদ্দিন চৌধুরী-ই। অবশ্য. বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের ১১ জন সম্ভাব্য প্রার্থী নানা মাধ্যমে প্রচারণায় নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। এরা নিজ নিজ দল বা জোটের মনোনয়নও চাইবেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের মতে, দিরাই-শাল্লায় এখনো ব্যক্তি ইমেজই মুখ্য, তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি চাইবে আওয়ামী লীগের এই দূর্গ ভাঙতে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টায় নানা কৌশল নিচ্ছে। দুই দলেই রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল গত প্রায় ১০ বছর ধরে। দিরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত আব্দুশ শহীদ চৌধুরী’র নেতৃত্বে একাংশ কাজ করেছে দীর্ঘদিন। এই অংশের সমর্থকরা আব্দুশ শহীদ চৌধুরীর ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী অ্যাডভোকেট তাহির রাহয়ান চৌধুরীকে প্রার্থী দেখতে পোস্টার-লিফলেট, ফেইসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে থাকায় সেখানেও তাঁর পক্ষে মনোনয়ন তদবির করছেন তাঁর সমর্থকরা। দলীয় মনোনয়ন না পেলে এই অংশটি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে না কি নিস্ক্রিয় বা কৌশলে আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকেন সেটি দেখার বিষয়। অপরদিকে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এই আসনে বহুদিনের। সম্প্রতি. দলটির একাংশ অনেকটা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়লেও দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলতাব উদ্দিনের নেতৃত্বে দলের ছোট একটি অংশ বিগত উপ-নির্বাচনে প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধীতা করেছেন। তাদের অবস্থানও আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হলেই পরিস্কার হবে।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একনাগারে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে প্রয়াত
 সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে মাত্র ৫০০ ভোটের ব্যবধানে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। অবশ্য ঐ সংসদের মেয়াদকালীন সময়েই বানিয়াচঙ-আজমিরিগঞ্জ আসনের উপ-নির্বাচনে জয়ী হন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মৃত্যুর পর নৌকার হাল ধরেন ড. জয়া সেন গুপ্তা। ৩০ মার্চের উপ-নির্বাচনে ড. জয়া সেন গুপ্তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রবাসী ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেন রেজু। বিএনপি নির্বাচনে না গেলেও নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রকাশ্য প্রচারণায় নামেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাও প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন। নির্বাচনে প্রায় ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জয়া সেন গুপ্তা।
এবার এই আসনে মনোনয়ন প্রাপ্তির আশায় এই দুই প্রার্থী ছাড়াও যারা পোস্টার-লিফলেটসহ নানা প্রচারণায় নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন, এরা হলেন- জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চয়ারম্যান অ্যাডভোকেট অবনী মোহন দাস, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামছুল ইসলাম, দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুর রহমান বুলবুল, কেন্দ্রীয় যুবলীগের নির্বাহী সদস্য ব্যারিস্টার অনুকূল তালুকদার ডাল্টন, যুক্ত্যরাজ্য প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা সামছুল হক। দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুস শহীদ চৌধুরীর ছেলে যুক্তরাজ্য বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল।
জামায়েতে ইসলাম, জাতীয়পার্টি, সিপিবি, জাসদসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীদের তেমন তোন তৎপরতা নেই এই আসনে। তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে গত উপ নির্বাচনে মনোয়ন সংগ্রহ করেছিলেন জেলা জাপা নেতা জাহির আলী। ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মাওলানা শোয়াইব চৌধুরী, গণতন্ত্রি পার্টির নেতা গুলজার আহমদ এই আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী।
দিরাই ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ মিহির কান্তি দাস বলেন,‘দিরাই-শাল্লা নি:সন্দেহে আওয়ামী লীগের আসন। প্রার্থী হিসাবে ড. জয়া সেন গুপ্তাই জনপ্রিয়। বিএনপির নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে লড়তে ড. জয়া সেন গুপ্তার বিকল্প তৈরি হয়নি। কিন্তু এখানকার দল এবং নেতৃত্ব কিছুটা সংকটে রয়েছে। দলীয় নেতা দিরাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান, দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশারফ মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়, সাংগঠনিক সম্পাদক অভিরাম তালুকদার খুনের মামলার আসামী। এরা সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারছেন না। শাল্লায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাসের সম্পর্ক খুবই খারাপ। এরা একজন-অপরজনের উল্টোপথে হাঁটছেন। বিএনপি নির্বাচনে আসলে আওয়ামী লীগকে আরো কৌশলী হয়ে নামতে হবে প্রচারণায়। এই আসনে আওয়ামী লীগের ভোটার-সমর্থকের অভাব নেই। আওয়ামী লীগের পক্ষের সুশীল সমাজও শক্তিশালী। এখনই উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মীসহ সকল পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় করতে হবে এবং দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজে যুক্ত করতে হবে।’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সর্দার রুমি বললেন,‘দিরাই শাল্লায় নাছির উদ্দিন চৌধুরী এবং ড. জয়া সেন গুপ্তা ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে তেমন কোন আলোচনা কেউ করছে না। এই আসনে দলের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজের ভোট বেশি। এখনো ড. জয়া সেন গুপ্তা ৮ বারের সংসদ সদস্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের ইমেজকে কাজে লাগাচ্ছেন। নাছির উদ্দিন চৌধুরীও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ইমেজকেই কাজে লাগিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসাবে ২ বার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তিনি বিএনপির রাজনীতি করলেও তাঁর ব্যক্তি ইমেজই এখানে ভোটের রাজনীতির শক্তি।
নির্বাচন ও দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের সভাপতিম-লির সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা বলেন,‘দলীয় সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা যদি মনোনয়ন দেন তাহলে নির্বাচন করবো, মনোনয়ন না দিলে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, আমি তাঁর পক্ষে কাজ করবো। দিরাইয়ের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাঁরা প্রকাশ্যে না আসতে পারলেও দলের জন্য কাজ করছেন। যারা খুনের মামলার আসামী হয়েছেন, দিরাইবাসীসহ সকলেই জানেন, তাঁরা এমন ঘটনায় যুক্ত ছিলেন না। আমি আশা করছি তাঁরা এই মামলা থেকে মুক্ত হবেন এবং দিরাইবাসী ও দলের জন্য কাজ করবেন। শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস একজন ভাল নেতা ও সংগঠক, আমার বিশ্বাস তিনি কখনোই দলের প্রার্থীর বিপক্ষে থাকবেন না।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘আমি দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম, দিরাই-শাল্লায় বার বার নির্বাচন করেছি, হেরেছি-জয়ীও হয়েছি, এই আসনে আমি ছাড়া বিএনপির আর কোন প্রার্থী নেই। দলে কোন গ্রুপও নেই।’
শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস বলেন,‘আমি ওকালতি ছেড়েছি ১৯৯৬ সালে। সেই থেকে মাঠে আছি। দিরাই-শাল্লার ১৩ ইউনিয়নের ৮ ইউনিয়নে ঘরে ঘরে পদচারণা আমার। উপ-নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়েছি, আগামী নির্বাচনেও চাইবো, দলীয় মনোনয়ন পেলে আশা করি ভাল করবো। না পেলে নৌকার পক্ষেই কাজ করবো।’
দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুর রহমান বুলবুল বলেন, ‘ড. জয়া সেন গুপ্তা নির্বাচন করতে চাইলে, আমি তাঁর কর্মী, তিনি কোন কারণে নির্বাচন না করলে আমি মনোনয়ন চাইবো।’
যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা, দিরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত আব্দুশ শহীদ চৌধুরীর ছেলে অ্যাড. তাহির চৌধুরী পাবেল বলেন,‘জাতীয়তাবাদী শক্তির এখন প্রথম কাজ বিএনপিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, আমি এই আসনে প্রার্থী হবো।’
কেন্দ্রীয় যুবলীগের নির্বাহী সদস্য ব্যারিস্টার অনুকূল তালুকদার ডাল্টন বলেন, ‘১৮৮৮ সাল থেকে আমি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। ওয়ান ইলিভেনের সময় নেত্রী ও দলের পক্ষে লন্ডনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। উপ-নির্বাচনে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছিলাম, পাইনি। দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবো।’  

  • [১]