আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৩-২০২৪) থেকে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে একক ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সরকারি সিদ্ধান্তটি উচ্চশিক্ষার জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হবে। সোমবার বিকালে ইউজিসিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে একক ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য একটি ন্যাশনাল টেস্টিং অথরিটি (এনটিএ) গঠনের কথা জানিয়েছেন। উচ্চ পর্যায়ের এই সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিবৃন্দসহ নীতি নির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। একক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে সকলেই একমত হয়েছেন। গত কয়েক বছর যাবৎ দেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বেশ কিছু পুরনো ও বড় বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে নিজস্ব নিয়মে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে আসছিলো। এইচএসসি পরীক্ষার পরদিন থেকে কোচিং এবং ফলাফল প্রকাশের পর থেকে যে ম্যারাথন ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হয় তাতে তাঁরা প্রচ-রকম আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক চাপে থাকেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মোটামুটি ৬ মাস পর্যন্ত দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অসংখ্য ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে এসব শিক্ষার্থীর যে পরিমাণ আর্থিক খরচ হয়ে থাকে তা বহন করার মতো সক্ষমতা প্রান্তিক পরিবারগুলোর থাকে না। ফলে প্রান্তিক ও অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী সন্তানরা ইচ্ছা থাকা সত্বেও কেবল আর্থিক অসঙ্গতির কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ইচ্ছা পরিত্যাগ করেন। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে একক ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্তে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি যুদ্ধের অন্যায় আয়োজন থেকে শিক্ষার্থীরা রেহাই পাবেন। এরকম শিক্ষাবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য আমরা শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই।
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ভর্তি পরীক্ষার মান নিয়ে কোনো সংশয় থাকার কারণ নেই। কারণ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সারাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সে নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি। তিনি যথার্থ বলেছেন। ভিতরের কথা হলোÑ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বিশাল বাণিজ্য করার সুযোগ পেয়ে থাকে। এই ভর্তি বাণিজ্যের কারণেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তথাকথিত মানের প্রশ্নকে সামনে এনে একক ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করে আসছিলেন। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ মেধার ভিত্তিতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাবে এবং সেখানে অধ্যয়নের পর তাঁরা দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করবে। এমন একটি শিক্ষা পরিবেশই সকলের কাম্য। এই জায়গায় যদি শিক্ষার্থীদের একটি অসম ও ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতা নামক চক্রের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই ওই পরিবেশ নষ্ট হবে। আবার এ কথাও সত্য এইচএসসি পাস করা সকল শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দরকার নেই। এদের মধ্যে মেধাবীরাই উচ্চস্তরে আসবে এবং বাকিরা নানামুখী কারিগরি ও কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে কর্মে বিনিয়োজিত হবে। কিন্তু আমাদের হরেদরে সকল শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। এটিও কোনো দেশের উচ্চশিক্ষার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এখন সকল জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেটি কতটুকু সুচিন্তাপ্রসূত তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। বরং যদি প্রতি জেলায় যথেষ্ট পরিমাণে কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতো তাহলে দেশে ও বিদেশে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ভালো কাজের সুযোগ তৈরি করে নিতে পারত।
একক ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের যে সিদ্ধান্ত শিক্ষামন্ত্রী জাতিকে জানিয়েছেন আমরা আশা করব তার আর কোনো পরিবর্তন হবে না। ঘোষণা অনুসারে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই তা বাস্তবায়ন করা হোক এটিই আমরা চাই। এই ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য যে ন্যাশনাল টেস্টিং অথরিটি গঠনের কথা সেটি অবিলম্বে গঠন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মানসম্মত উপায়ে প্রকৃত মেধাবীদের চিহ্নিত করে যার যার উপযুক্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি করে দেয়া হোক।