দেশে বন্ধ হচ্ছে অনুমোদনহীন পিস স্কুল। জামায়াত-শিবিরের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক আদর্শে পিস স্কুল চলছে- গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ও গণমাধ্যমে এমন তথ্য বেরিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে অবশেষে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আদেশ জারি করে অনুমোদনহীন সকল পিস স্কুল অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার লালমাটিয়ায় পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঠদানের অনুমতি বাতিল করতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকেও নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, বিতর্কিত কার্যক্রমে লিপ্ত থাকায় অনুমোদন পাওয়া লালমাটিয়ার পিস স্কুলটির পাঠদানের অনুমতি বাতিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পিস স্কুল পরিচালনার সঙ্গে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার বিরোধী শক্তি জড়িত’ মন্তব্য করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষা ‘জঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রকে’ উৎসাহিত করছিল। দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা পুষ্ট, তাদের ভাবধারার সংক্রামক, জঙ্গি তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী কোনো প্রতিষ্ঠানই এ দেশে চালু থাকা উচিত নয়। পিস স্কুল ছাড়াও অন্য নামে দেশে অনুরূপ ভাবধারার প্রতিষ্ঠান সচল আছে কিনা সে ব্যাপারে জোরালো তদন্ত দরকার।
গুলশান আর্টিজান ক্যাফেতে হামলাকারী অন্তত দুজন জঙ্গি জাকির নায়েকের বক্তব্যে প্ররোচিত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠার পর দেশে জাকির নায়েকের পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধে গত ১১ জুলাই সরকারের সিদ্ধান্ত আসে। পিস টিভি বন্ধের পরপরই দাবি ওঠে- পিস টিভির লগো সংবলিত জাকির নায়েকের মতাদর্শের অনুসরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পিস স্কুলগুলোও বন্ধের। ‘পিস’ শব্দটি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরণের শতাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদনের বাইরে জামায়াতের দলীয় আদর্শের পাঠ্যবই পড়ানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রায় সবাই জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী। এসব স্কুলের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তবে জনগণের চোখে ধুলা দিতে কোথাও আওয়ামী লীগের নেতা আবার কোথাও বিএনপি নেতাদের সভাপতিসহ পরিচালনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয়েছে। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে দেশে অন্তত ২৭টি পিস স্কুলে জামায়াত-শিবিরের কর্মকান্ড চলার প্রমাণ মিলেছে আগেই। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ‘পিস’ নামের তিনটি স্কুলকে শোকজও করেছিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।
জানা যায়, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নির্দেশ সত্ত্বেও উগ্রবাদী এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া আটকে ছিল কয়েক মাস। দেশ-বিরোধী তৎপরতার সহায়ক এসব প্রতিষ্ঠান চালু রাখার পক্ষেও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে সক্রিয়তা অব্যাহত ছিল। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত পিস পিস স্কুল বন্ধের নির্দেশ এসেছে, এটা স্বস্তির খবর। তবে কাগজপত্রে ‘পিস’ শব্দযুক্ত নামের স্কুল বন্ধ রাখাই সমাধান নয়। পিস টিভি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পিস স্কুলের সাইনবোর্ড নামানো ও নাম পাল্টানোর খবর আসছে সংবাদ মাধ্যমে। এছাড়া বিভিন্ন সময়েই সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়েছে যে, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হয় না, সরকারি কারিকুলামের বাইরেও নানা মতাদর্শের বই পড়ানো হয়। শিশুদের মনোবিকাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম, ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনা, মানবিকতাবোধ বপন করা গেলে, নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগ ঘটানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশবিরোধী, মানবতাবিরোধী, জঙ্গি-সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হবে না। বলাই বাহুল্য, দেশে একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সচেষ্ট রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়-সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন করে জঙ্গি বানানোর কাজে। এদের তৎপরতা রুখতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। দেশে অনুমোদনহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু আছে কিনা, কিংবা অনুমোদনহীন কোনো পাঠ্যক্রম কোথাও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কোনোরূপ দায়সারাভাব বা উদাসীনতা দেখানো যাবে না।