জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বুধবার কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কিছু প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তিনি শক্তিধর দেশগুলোকে ‘সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ে’ এমন প্রবাদের সাথে তুলনা করেছেন। এরকম সারকথার পাশাপাশি তিনি সঞ্চয়পত্রের সুদ হারের বৈষম্য কমানোর জন্যও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট দূর করতে বিনিয়োগযোগ্য ঋণের সুদহার কমানোর জন্য সরকার এক বছর আগে সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতের সুদহার ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিু ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর উপর। বহু পরিবারের মাসিক খরচের জোগান আসে এইসব সঞ্চয়ের মুনাফা বা সুদ থেকে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এই সঞ্চয়ের উপর নির্ভরশীল থাকেন ব্যাপকভাবে। সুদের হার ক্ষেত্র বিশেষে এক তৃতীয়াংশ হ্রাস করায় এইসব পরিবারে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়াসহ জীবন যাপনের ব্যয় বিপুল পরিমাণে বর্ধিত হওয়ার পাশাপাশি মাসিক আয় কমে যাওয়ার কারণে সঞ্চয়নির্ভর এইসব পরিবার এখন মাস কুলোতে বিশেষ বেগ পাচ্ছেন। অথচ সুদহার হ্রাস করার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কতটুকো প্রাণসঞ্চার হয়েছে তার কোন পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক থেকে বড় দাগে যারা ঋণ গ্রহণ করেন সেইসব শিল্পঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কুঋণে পর্যবসিত হয়ে এখন অনাদায়যোগ্য হয়ে পড়ে আছে। বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠী ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে বিভিন্ন কায়দায় টাকা লুটে নিচ্ছে। এইসব শিল্পপতিদের কম হারে ঋণ দেয়ার জন্য সাধারণ আমানতকারীর স্বার্থ বিঘিœত করা কোন গণমুখী সরকারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। সুদহার কমানোর মন্দ প্রভাব যে সরকারের অভ্যন্তরেও আলোচিত হচ্ছে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য এর প্রমাণ। এখন যদি কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য আমলে নিয়ে সরকার আমানতের সুদহার কমানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেন তাহলে স্বস্তি পাবেন দেশের কোটি কোটি নিু ও মধ্যবিত্ত নাগরিকগোষ্ঠী।
বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলোর তারল্য সক্ষমতা থাকতে হয়। তারল্য সক্ষমতা বাড়ানোর একমাত্র উপায় হলো সঞ্চয় বৃদ্ধি। শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে যেয়ে সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংক ও সরকারের সঞ্চয় আহরণের জায়গাটি সংকুচিত হয়ে যায় কিনা সেটিও সমভাবে বিবেচনা করতে হবে। সুদহার কমানোর এক বছরের মাথায় এসে সঞ্চয় পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এর চিত্র বেরিয়ে আসবে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ করতে চাই যে, সুদহার কমানোর পরে সঞ্চয়কারীরা তাদের আমানত ব্যাংকে বা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে। নতুবা ব্যাংকগুলোর সংকট নতুন আকারে পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আমরা নিশ্চিত এক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিসংখ্যানই বেরিয়ে আসবে। কারণ সঞ্চয় বাড়ার পিছনে প্রদত্ত মুনাফার বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। মানুষ ব্যাংকে বা সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমতে দেখে হয়তো নিজস্ব উপায়ে বিনিয়োগের চেষ্টা করবেন। তখন তাদের এই অনভিজ্ঞ বিনিয়োগ প্রচ- ঝুঁকির মধ্যে পতিত হবে। সাধারণ নাগরিকদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়াও সরকারের অনুচিত কাজ হবে।
সঞ্চয়পত্রে কৃষিমন্ত্রী ‘বৈষম্য’ কমানোর তাগিদ দিয়েছেন। এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টিই আসল কথা। সাধারণ মানুষের মুনাফা কমিয়ে বড়লোকদের সুবিধা তৈরি করে দেয়ার মাধ্যমে কথিত বৈষম্য কেবল বাড়তেই থাকবে। এই সত্য উপলব্ধির জায়গায় অর্থমন্ত্রীকে আসার জন্য আমরা অনুরোধ জানাই। তাহলে জাতীয় অর্থনীতির কল্যাণমুখী চরিত্রও সকলের সামনে উদ্ভাসিত হবে।