বিশেষ প্রতিনিধি
আট কেয়ার (দুই একর দুই কেয়ার) জমিতে বছরে তিন দফায় চাষাবাদ করেন কৃষক ফয়জুল বারী হাসিম। কৃষি কাজ করেই মাসে লাখ টাকা আয় সুনামগঞ্জের বিশ^ম্বম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দির এই কৃষকের। সবজি চাষেই আয় বেশি তার। এই মৌসুমে বাড়িতে ‘জিরো এনার্জি কুল চেম্বার’ করে নিজের এবং প্রতিবেশির সবজি ৭ থেকে ৮ দিন রাখার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। জিরো এনার্জি কুল নির্মাণের খরচের টাকা স্থানীয় কৃষি অফিসই দিয়েছে। বললেন, বাজারে দাম কম থাকলে বিক্রি না করে এনার্জি কুল চেম্বারে ৭-৮ দিন রাখা যায় সবজি। ফয়জুল বারীর নির্মিত জিরো এনার্জি কুল চেম্বারকে কৃষি অফিস এখন নিজেদের প্রদর্শনি হিসাবে দেখাচ্ছে অন্য কৃষকদের।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সম্প্রতি দেশে ‘অনাবাদী পতিত জমি ও বসত বাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি স্থাপন প্রকল্প’এর আওতায় ‘জিরো এনার্জি কুল চেম্বার’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এনার্জি কুল চেম্বারে ৭ দিন টাটকা থাকে সবজি। এটি হিমাগার বা ফ্রিজ’এর মতো বিদ্যুত চালিত নয়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় কেবল পানি দিয়েই তরতাজা রাখা যায় সবজি।
কৃষি অফিসের সহায়তায় ইউটিউবে ভিডিও দেখে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের কৃষক ফয়জুল বারী নিজেই জিরো এনার্জি কুল চেম্বার তৈরি করেছেন। এই জিরো এনার্জি কুলে কেবল ফয়জুল বারী নয় চিনাকান্দির ধুতপুর এলাকার অনেক কৃষকই এখন সবজি এনে রাখেন। ফয়জুর বারী বললেন, সবজি প্রধান এলাকায় প্রতি গ্রামে এক দুইটি জিরো এনার্জি কুল চেম্বার করা গেলে ভালো হয়।
বিশ^ম্ভরপুরের চিনাকান্দি বাজারের পাশেই ধুতপুর গ্রামের বাসিন্দা ফয়জুল বারী’র। বাবা প্রয়াত আজিম উদ্দিনও কৃষক ছিলেন। গ্রামের পাশের ধনপুর চিনাকান্দি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা শেষে চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে মিসকাত পাস করেছিলেন ফয়জুল বারী। বাড়ি এসে চিনাকান্দি মাদ্রাসায় পাঁচ বছর দুই হাজার টাকা বেতনে শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি।
২০১৮ সালের শুরুর দিকে মাদ্রাসার চাকুরি ছেড়ে কৃষি কাজ শুরু করেন ফয়জুল বারী। সেই থেকেই ভাগ্য ফিরতে থাকে তার। আট কেয়ার জমিতে প্রথম আমন ধান, পরে শাওনি জাতের ধান চাষাবাদ শেষে সবজি চাষ করেন তিনি। টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গ্লোকপি (সবুজ ফুলকপি) চাষাবাদ করছেন এবার।
জানালেন, কৃষিতে যুক্ত হবার প্রথম বছরেই আশার সঞ্চার ঘটে। খরচ বাদেই প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় করেন। পরের বছর ৮ লাখ টাকার মতো আয়। এই বছর আরও বেশি আয় হবে ধারণা করছেন তিনি।
ফয়জুল বারী বললেন, গেল বছর করোনার জন্য সবজি সুনামগঞ্জের বাইরে পাঠাতে পারেন নি। এজন্য আয় কম হয়েছিল। এই বছর যেভাবে আয় হচ্ছে, তিনি আশা করছেন তার আট কেয়ার জমিতেই গড়ে খরচ বাদে এক লাখ টাকা আয় হবে।
তিনি বললেন, পড়াশুনা শেষেই কৃষি কাজ শুরু করলে আরও ভাল করতাম। মাঝখানে ৫ বছর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করায় কৃষি কাজে মন দিতে পারেন নি। না হয় নিজের আয় আরও বেড়ে যেত, দেশের জন্যও ভালো হতো।
জিরো এনার্জি কুলে আলোচনায়
কৃষি অফিসের সহায়তায় ইউটিউবে ভিডিও দেখে ফয়জুল বারী জিরো এনার্জি কুল তৈরি করে এলাকায় আলোচিত। তার তৈরি জিরো এনার্জি কুল এখন কৃষি অফিসের প্রদর্শনি। চার মাস আগে এই জিরো এনার্জি কুল তৈরি করেছেন কৃষক ফয়জুল বারী।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা ইউটিবের একটি ভিডিও দেখিয়ে তাকে এটি তৈরি করার জন্য অর্থ দেন। তিনি বাড়ির একটি বড় গাছের নীচের ছায়া অংশে ৭৩ ইঞ্চি লম্বা ও ৪৪ ইঞ্চি প্রস্ত ও ২৬ ইঞ্চি উচ্চতার জিরো এনার্জি কুল তৈরি করেন। পানির পাইপ, কটনবার, টেপ বসানো পানির একটি ড্রাম ব্যবহার করতে হয়েছে তাতে। জিরো এনার্জি কুলে তিন থেকে চার মণ সবজি সাত থেকে আট দিন তরতাজা রাখা যায়।
ফয়জুল বারী জানালেন, গত ২৫ নভেম্বর থেকে তারা এই জিরো এনার্জি কুল ব্যবহার করছেন। সবজির দাম যখন বাজারে ওঠা নামা করে তখন জিরো এনার্জি কুল অনেক কাজে লাগে। সাত আট দিন একেবারে তরতাজা থাকে সবজি। তবে বেশি পরিমাণে সবজি রাখার কোন ব্যবস্থা নাই এখানে।
অসঙ্গতি যেখানে
সুনামগঞ্জ জেলায় প্রদর্শনি হিসাবে দুটি জিরো এনার্জি কুল করা হয়েছে। একটি বিশ^ম্ভরপুরের চিনাকান্দিতে। আরেকটি জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও’এর কদমতলায়। ‘অনাবাদী পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি স্থাপন প্রকল্প’এর আওতায় এই দুটি জিরো এনার্জি কুল দু’জন কৃষকই তৈরি করেছেন। এজন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। একটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা।
কিন্তু চিনাকান্দির ফয়জুল বারী জানিয়েছেন, তার বাড়িতে জিরো এনার্জি কুল তৈরিতে ৫০০ ইট লেগেছে, যার মূল্য ছয় হাজার টাকা, বালু লেগেছে ৫০০ টাকার, পানির ড্রাম ৩০০ টাকা, কটনবার, পাইপ ও চাটাই মিলে আরও ২০০০ টাকা। তাকে ১০০০ টাকা কৃষি অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমি একবার কোন বিষয় দেখলে নিজের আয়ত্বে নিতে পারি, এজন্য আমাকে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
ফয়জুল বারী জিরো এনার্জি কুল তৈরিতে নয় হাজার ৮০০ টাকার হিসাব দিলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল কুমার সোম বললেন, সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর ও জগন্নাথপুরে কৃষকরা নিজেরাই জিরো এনার্জি কুল তৈরি করেছেন। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প থেকে ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশ^ম্ভরপুরের কৃষকের দাবি সত্য নয় উল্লেখ করে তিনি বললেন, মালামাল কৃষি অফিসের লোকজন কিনে দিয়েছেন, তিনি কেবল তৈরি করেছেন। তিনি জানান, এই জিরো এনার্জি কুল ১৫ বছর সচল থাকবে, তিন মণ সবজি সাত থেকে আট দিন সংরক্ষণ করা যাবে। কৃষকের সংরক্ষণ এবং সংগ্রহ খরচ কমে যাবে।