ইয়াসমিন নাহার রুমা
সূর্যের আলোয় রাতের অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে উজ্জ্বল করার সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে শিক্ষা, যা একটি দেশকে বা একটি জাতিকে নয়-আলোকিত করেছে গোটা বিশ্বকে আর প্রতিফলিত হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি জাতির মধ্যে ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রাথমিক শিক্ষা মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ে। আর তাই প্রাথমিক শিক্ষায় যে দেশ যত সচেতন সে দেশ তত উন্নত। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা ক্ষেত্রে বাধাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে নিম্নলিখিত চ্যালেঞ্জসমূহ পরিলক্ষিত হয়েছেঃ
* অবকাঠামোগত সমস্যা
* ঝরে পড়া
* অভিভাবকের অসচেতনতা
* শিক্ষকদের মুটিভেশনের অপর্যাপ্ততা
* দারিদ্র্য
* যাতায়াত ব্যবস্থা
* সামাজিক নিরাপত্তা
* জনবল সংকট
* শুদ্ধভাষা চর্চায় পর্যাপ্ত আগ্রহের অভাব
* নৈতিক শিক্ষায় অপ্রতুলতা
* ভৌগলিক অবস্থান
উল্লিখিত চ্যালেঞ্জসমূহ নিরসনে সুপারিশমালা
* সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরার জন্য বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
* শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ের পরিবেশ আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করার পাশাপাশি অভিভাবক সমাবেশ, মিড ডে মিল কার্যক্রম জোরদারকরণ, শিশুশ্রম বন্ধ ও পর্যাপ্ত মনিটরিং এবং হোম ভিজিট এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
* অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে উদ্ভুদ্ধকরণ ও বিভিন্ন কার্টুন বা নাটিকার মাধ্যমে শিক্ষার সুফল সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে। সেই সাথে বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের আমন্ত্রণ জানানো ও পুরস্কৃতকরণ।
* দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের গৃহিত বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রেণীকক্ষে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সহায়তা প্রদানের জন্য স্থানীয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও শতভাগ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় নিয়ে আসা।
* সুনামগঞ্জ জেলাটি হাওর বেষ্টিত হওয়ায় বিভিন্ন মৌসুমে যাতায়াত ব্যবস্থার ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে বর্ষার মৌসুমে শিক্ষার্থীদের জন্য ছাতা, রেইনকোট এবং পর্যাপ্ত নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
* সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুরুতেই সমাজের সকল শ্রেণির জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে বিভিন্ন সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
যেমন- ১। বিভিন্ন উঠান বৈঠকের আয়োজন ২। সভা সেমিনার ৩। গণমাধ্যমে শিক্ষামূলক প্রচারণা ইত্যাদি।
* প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কর্মকর্তা এবং শিক্ষকসহ যে সকল শূণ্য পদ রয়েছে তা পূরণে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
* শুদ্ধ ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে তদারকি কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সকলকে আরও মনোযোগী হতে হবে।
* শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি নিয়মিত নৈতিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে যাতে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা নৈতিক শিক্ষা লাভ করে ভবিষ্যতে আলোকিত মানুষ হতে পারে।
* প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ শেণিকক্ষে সফলভাবে যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য তদারকি জোরদার করতে হবে।
* শিক্ষকদের মুটিভেশন বাড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
* সীমান্তবর্তী এলাকায় শিশুরা যেন মাদক সেবন এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে না পড়ে সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সর্বোপরি, এসডিজির ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে উপর্যুক্ত চ্যালেঞ্জসমূহ নিরসনে প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অনায়াসেই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে; এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা।
লেখক : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর।