অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে জাতীয় পতাকা আবার বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কেন এমনটি হচ্ছে। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় দু’দিন আগে মহান বিজয় দিবসে চতুর্কোণ আকৃতির লাল সূর্য এঁকে পতাকা বানিয়ে বিজয় দিবস পালন করেছে। এমন আর্কিটেক্ট বিশ্ববিদ্যালয় পেলো কোথায় ?
সূর্যের আকৃতিটা দেখেছেন পতাকার সবুজ রংটা লক্ষ করেছেন কি? এটাও সঠিক নয়। তাহলে কী দাঁড়ালো? হাজার বছরের প্রত্যাশা বুকে লালন করে লাখো কোটি নর-নারী রক্ত ঢেলে যে আর্কিওলজি অঙ্কন করেছে তা আজ সস্তা আবেগে বিকৃত হচ্ছে।
কবির বর্ণনায় “সবুজের বুকে লাল সূর্যটা ঝলোমল”, তাহলে এ সবুজ কোন্ সবুজ রং আমার পতাকার রং? হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, পিঙ্গল সবুজ নাকি ‘শেওলার বুকে লাল সূর্য ?
বিগত ২০১৯ সনে মহান বিজয় দিবসের প্রস্তুতি সভায় জেলা প্রশাসককে রঙ-বেরঙ্গের পতাকা কথা উল্লেখ করে সুনামগঞ্জ থেকে সরকারকে আবেদন পাঠাতে অনুরোধ করেছিলাম। ঊনোপঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশে অন্তত একটি বিষয় ঠিক হোক তাই আমার প্রস্তাবটি ছিলো, অনেক সবুজের মাঝে কোন্ সবুজ রংটি আমার পতাকার ব্যবহার্য রং হবে তা রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেবে। যে সবুজ রং দিয়ে আমার পতাকা হবে তা আর কেউ অন্য কাজে পোশাকে আশাকে ব্যবহার করবে না। উদাহরণ দিয়েছিলাম আমার আর্মি-বিজিবি-পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্মের কাপড় বা রং যেমন যে কেউ ব্যবহার করতে পারে না।
আর এই পতাকা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমার সেনাবাহিনীর হেফাজতে তৈরি হবে বিপণন করবে জেলা প্রশাসন। তখন যেখানে সেখানে যেনতেন রঙ্গে কেউ পতাকা তৈরি-বিক্রি করতে পারবে না দেশকেও বিকৃত দেখাবে না। সাথে সাথে আমার প্রস্তাবনার জন্য সাধুবাদ জানিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান নিলেন জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জিআই ফাইভের স্ট্যান্ডসহ একই মাপের পতাকা বিতরণ করবেন। এবারে ২০২০ সালে মহান বিজয় দিবসের প্রস্তুতি সভার আলোচনায় জানলাম যেসব প্রতিষ্ঠানে স্ট্যান্ড দিতে পারেননি এবারে তা পুরো করবেন। আমি চাইলাম কী আর প্রশাসক বঝলেন কী আর করলেন কী ? তাও বলি এতো খরচ করে জিআই ফাইভের স্ট্যান্ড দিতে হবে কেন ?
প্রকৃতির বাঁশ বন বেতের বাংলাদেশ। গ্রামে বাঁকা বাঁশকে আগুনের ছ্যঁকাদিয়ে কীভাবে নলের মতো সোজা করে কারুকার্য দেখলে অবাক হতে হয়। তাছাড়া শিক্ষকদেরকে এতে পরনির্ভশীল করলে চলবে না তাদের তো একটু দায়িত্বশীল নির্ভরশীল না করে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
আমার দাবিটা শুধু সুনামগঞ্জ জেলার জন্য ছিলো না, সারা দেশের জন্য। তাহলে আজ রংপুরের পায়রাবন্দে এমন হাস্যকর ঘটনা ঘটতো না দেখতে হতো না। আর বিষয়টি রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়ন হলে চিরদিন সুনামগঞ্জ ও ডিসি আব্দুল আহাদ সাবের নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকতো। আজ জানলান জনাব আহাদ সাব সুনামগঞ্জ ছেড়ে অন্যত্র বদলি হয়ে যাচ্ছেন শুনে মনে ব্যথা অনুভব করলাম।
অন্য একটি বিষয় আজই ৭১ টিভি আজ সন্ধ্যা ছ’টার খবরে দেখিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মহান বিজয় দিবসের ব্যানারে বায়ান্নের শহিদ মিনারের ছবি দিয়ে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ব-শিক্ষিতের জন্য তা যথোপযুক্ত কাজ হয়নি। ধন্যবাদ জানাতে হয় ৭১ টিভিসহ নতুন প্রজন্মকে এই জন্য যে বিষয়গুলি প্রজন্মের নজরে সূক্ষাতিসূক্ষভাবে ধরা পড়ছে। তবু অশুদ্ধ শহীদ বানানটা লিখতে কেউ কার্পণ্য করছেন না। কেন শহিদ কেন শহীদ নয় বিচার বিশ্লেষণ করছেন না।
অন্য একটি সমালোচনাও করতে হবে যে স্বভাবসিদ্ধ ভুলে ভুল করে না হয় শহিদ মিনারের ছবি দিয়েছে কিন্তু বিজয় দিবসের ফুলের তোরাটা ঠিকই বায়ান্নর মিনারেই সমর্পণ করেছে। কেননা, রাষ্ট্রীয় এমন নির্দেশনা বা পরামর্শ নেই যে প্রত্যেক শহিদ মিনারের পাশে একটি স্মৃতিশৌধ বা বিজয় তোরণ থাকতে হবে। সুতরাং ভুল করালে তো ভুল হবেই।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সুনামগঞ্জ জেলা শাখা