ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে। ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারা রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে এ শিল্প। এক সময়ের আমদানিকারক দেশ, এখন ওষুধের রপ্তানিকারক দেশের গৌরবে গৌরবান্বিত। এ দেশের উৎপাদিত ওষুধ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণসহ বিশ্বের ১০৯টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ওষুধ রপ্তানি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে নতুন করে আশা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প।
জানা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার ৩৩৮টি ছোট-বড় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে বেশকিছু কারখানা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো, স্কয়ার, প্লাক্সো, রেনেটা, ইনসেপটা, হেলথ কেয়ার, এসকেএফ, সেনডোজসহ বেশকিছু কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হয়। দেশের উন্নতমানের ৫৪টি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রুপের ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। ২০১৫ জুলাই থেকে ২০১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিশ্বমানের ৫৪টি ওষুধ কোম্পানির কারখানাতে উৎপাদিত ৮৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৭ টাকার ওষুধ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ১২৫টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছিল। এই মুহূর্তে বিশ্বের অনুন্নত ৪৮ দেশের মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে শীর্ষে বাংলাদেশ। ২৫৭ কোম্পানির ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিদেশে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় একশ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের কয়েক ওষুধ কোম্পানি আমেরিকায় ওষুধ রপ্তানির শুরু করেছে। এই সুযোগকে ‘দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য খুব ইতিবাচক’ উল্লেখ করে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গেলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ওষুধ খাত তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বড় একটি খাত হয়ে উঠবে।
ওষুধ খাতে অর্জনের পেছনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধ শিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এর বিকাশ সামনে আরো বাড়বে। ওষুধ শিল্পের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় শিল্পপার্ক গড়ে তোলার কথা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এই পার্কটির প্রধান উদ্দেশ্য ওষুধের ব্যবসায়িক প্রসার, বৈচিত্র্য সৃষ্টি, মান উন্নয়নে গবেষণা করা। এ ছাড়াও ওষুধ উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন ও যেসব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশেই তা উৎপাদন করা ও কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো বা বন্ধ করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০১০ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতা ও প্রতিকূলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ প্রকল্পের সফলতা তথা বাস্তবায়ন দেশের জন্য এক অভাবনীয় সাফল্য হিসেবেই বিবেচিত হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কেননা এটাই বাস্তবতা যে, যখনই কাঁচামাল আমদানি কমে আসবে এবং তা দেশেই উৎপাদন করা যাবে, তখন ওষুধের মূল্য কমে আসবে যা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।