ইয়াকুব শাহরিয়ার, শাস্তিগঞ্জ
৫ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধা ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মামাতো ভাই শহিদ কৃপেন্দ্র দাসের সাথে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চেই ভারতের বালাটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ফিরেছিলেন ২১ দিন পর। বালাটে তখন একই এলাকার আব্দুল জব্বার, আরমান আলী, শহিদ কৃপেদ্র দাস, হাজি আবদুল মতিন মতলিবরাও ছিলেন। এঁরা সবাই সম্মুখ সারিতে থেকে লড়াই করেছিলেন। বধ করেছিলেন অনেক শত্রু সেনাকে। আজ অনেকেই মরহুম হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যেই একজন সূর্য সন্তান হচ্ছেন নরেশ দাশ। পিতা মৃত ভারত দাশ। শান্তিগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁওয়ের রথপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। যখন বালাট থেকে ফিরেন তখন তাঁদের ইউনিট কমান্ডার ছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর। উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের ব্রিজের উত্তর পাড়ের সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানিদের এলোপাতাড়ি বুলেটে পায়ে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন কমান্ডার লস্কর। পরে তাঁদের নেতৃত্বদানের দায়িত্ব দেওয়া হয় হবিগঞ্জের আরেক বীরযোদ্ধা কয়ছর ও ভূঁইয়া সাহেবকে।
বয়স হয়েছে ঢের। চুলে-গোঁফে পাক ধরেছে। তবুও ছুটে যোদ্ধার এ শরীর। সাক্ষাৎকার নিতে যখন তাঁর বাড়িতে গেলাম তখন তাঁর বড় ছেলে জানালেন হাওরের পৌষালী জমিতে পানি সেচ দিতে গিয়েছেন। সাংবাদিক এসেছেন এ খবর পাঠাতেই হাতে একটি লাঠি আর পানি সেচের যন্ত্র (স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘হেমইত’) নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরছিলেন। পথেই তাঁকে পেয়ে যাই। মাথায় গামছা বাঁধা। যেনো একজন প্রকৃত জীবন যোদ্ধা। তখনই তাঁকে নিয়ে রথপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসে পড়ি। আমরা বলতে শুরু করি যুদ্ধ দিনের কথা।
কেমন কেটেছে যুদ্ধকালীন দিনগুলো?
এমন প্রশ্নে কিছুটা সময় থমকে গেলেন। চোখে-মুখে কেমন যেনো স্মৃতির ছাপ। খানিক্ষণ ভেবে বলেন, দুর্বিষহ দিনের কথা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না বাবা! চরম জীবন শঙ্কা নিয়ে প্রতিটি রাত দিন আমাদের কেটেছে। একবার রমজান রাজাকারের নেতৃত্বে পাগলায় হামলা চালানো হলো। আমরা দিগি¦দিক ছুটলাম। কেউ নদীপথে, কেউ পায়ে হেঁটে। যুদ্ধের প্রস্তুতি তখন ছিলো না। আরমান আলীদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হলো। পরবর্তীতে মতলিব ভাইর বাড়িতেও আগুন দেওয়া হলো। আমরা কেউ ঘরে ঘুমাতাম না। কখনো খড়ের ভোলায় বা গাদায়, কখনো অন্য গ্রামে, অন্য ঘরে। বালাটে যখন ছিলাম তখন খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম হতো না। পরে খ্বু কষ্টে দিন কেটেছে। মাইলের পর মাইল পথ পায়ে হেঁটে, নৌকায় পাড়ি দিয়েছি।
দুঃসহ কোনো ঘটনার কথা মনে পড়ে?
অসংখ্য দুঃসহ ঘটনা আছে। তারমধ্যে একটা হচ্ছে কৃপেন্দ্র দাসের শহিদ হওয়ার ঘটনা। সে আমার মামাতো ভাই। তার সাথেই বাড়ি ছাড়ি। দ্বিতীয়বার যখন বালাট থেকে ফিরেছি। তার কিছুদিন পর খবর পেলাম আমাদের সংবাদদাতা, সাহসী যোদ্ধা কৃপেন্দ্র দাসকে শত্রুরা ধরে ফেলেছে এবং তাঁকে নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে। আহ!….. কী কষ্ট। তাঁকে দেখতে পর্যন্ত পারছি না। পাঁচ দিন পর তাঁর লাশ আমরা নিয়ে আসি। এছাড়াও বেরিগাঁওয়ের যুদ্ধের পর অনেক লাশ বহন করতে হয়েছে। আমি নিজে ৩০ থেকে ৩৫টি লাশ টেনেছি। যেখানে লাশ মাটি দিয়েছিলাম সেখানে এখন স্মৃতি সৌধ হয়েছে শুনেছি। শত্রুর সাথে যখন লড়াই করেছি তখন ক্রলিং করে থাকতে হয়েছে অনেক সময়।
কেমন দেশের স্বপ্ন দেখেন?
শেখ মুজিবের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। যখন দেখি আমার পাড়ার স্কুলে উড়ে আমার নিজের পতাকা তখন গর্বে বুক ফুলে উঠে। এটাই আমার দেশ। এ পতাকার জন্যই তো আমরা অস্ত্র হাতে তুলেছিলাম।
যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী দেশ নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে?
এমন প্রশ্নে কিছুটা ভাবলেন। বললেন, নাহ্…। আক্ষেপ নাই। কিসের আক্ষেপ? কার কাছে আক্ষেপ করবো? যদি আমার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকতেন তখন তাঁর কাছে কিছু আক্ষেপ বা চাহিদা প্রকাশ করতাম। কিছুক্ষণ অনুনয় করার পর তিনি বললেন, আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাও পেয়েছি কয়েক বছর। দু’বছর হলো আমার ভাতা বন্ধ। কেনো বন্ধ, কী কারণে বন্ধ তাও জানি না। বিশ্বাস করো বাবা, যুদ্ধে কোনো চুক্তি করে যাইনি। যুদ্ধের পরে টাকা পাবো এমন চুক্তি তো আগে ছিলো না। দেশের টানেই তো গিয়েছি। এখন যেহেতু সবাই পাচ্ছেন, তাহলে আমি পাবো না কেনো? অন্তত আমাকে জানানোর তো দরকার ছিলো, ঠিক কোন কারণে আমার ভাতা বন্ধ। আমাকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়ে সে সম্মান কেড়ে নেওয়ার নোংরা চেষ্টা করা হচ্ছে। এর চেয়ে মৃত্যুই ভালো ছিলো। আমাকে সম্মান দিয়ে সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
সরকার বা সমাজের কাছে আপনার কোনো চাওয়া আছে?
আছে। দুইটা চাওয়া। এক. সমাজটা যেনো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বুকে নিয়ে বেড়ে উঠে। দেশটা যেনো দুর্নীতিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এগিয়ে যায়।
দুই. এটা আমার নিজের জন্য চাওয়া সরকারের কাছে। আমি মুক্তিযোদ্ধা। ভাতা পেয়েছি। এখন পাচ্ছি না। আমার এ বিষয়টি যেনো ভালো করে খতিয়ে দেখে আমার জীবদ্দশায় একটা উপায় করে দেন। মরার পরে দেখে কী লাভ। জীবন থাকতেই যেনো আমার সম্মানটা আমি ফেরত পাই। জয় বাংলা।