- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সরকারি শিক্ষকদের সন্তানকে সরকারি স্কুলেই পড়তে হবে!_প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি

সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছে, এবার থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে পড়াতে হবে। কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে কর্মরতরা তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ান না। পার্শ্ববর্তী কোনো কেজি স্কুল কিংবা অন্য কোনো বেসরকারি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করান। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভালো পড়াশোনা হয় না দেখে কি শিক্ষকরা তাদের সন্তানদের কেজি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন? শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এই প্রবণতা অন্যদেরও প্রভাবিত করছে। সরকারের শতভাগ ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণও এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটেই কর্তৃপক্ষের আদেশ জারি। শিক্ষা কর্তৃপক্ষের আদেশটিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়ে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ প্রয়োজনীয় মনে করছি।
আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক। দেশে ৬০ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও রেজিস্টার্ড প্রাইমারি এবং বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। আর এর বাইরে রয়েছে প্রায় সত্তর হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল। কিন্ডারগার্টেন স্কুল এখন অলি-গলি সর্বত্র বিস্তৃত। এগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা দেয়া হয়। স্মার্ট স্কুলে ভালো লোখাপড়া হবে এমন চিন্তা থেকে অভিভাবকরা সন্তানদের ওইসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করান। এখন তো থানা-ইউনিয়ন পর্যায়েও ব্যাপারটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, সমাজের নিচুতলার ছেলেমেয়েরা যাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর সচ্ছল ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়বে কিন্ডারগার্টেনে। অভিভাবক হিসেবে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বা শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারাও ব্যতিক্রম নন। যদিও অলি-গলিতে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনের সিংহভাগই মানসম্মত শিক্ষাদানের উপযুক্ত নয়, তারপরও এই অবস্থাটা তৈরি হলো কেন এটা খতিয়ে দেখার বিষয়। সরকারিভাবে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুন্নত অবকাঠামো, গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি, দুর্বল তদারকি, শিক্ষকদের গা ছাড়া-ভাব এসব কারণে এক সময় অধিকতর চাকচিক্যময় বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন অভিভাবকদের আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু এখনতো পরিস্থিতি পাল্টেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারের বিনিয়োগ বেড়েছে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি বেড়েছে, তারপরও কেন পড়ালেখায় ভালো এবং স্মার্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পছন্দের তালিকায় আসছে না সরকারি স্কুলগুলো? এত সুযোগ-সুবিধা দিয়েও কেন ভর্তি কোটা পূরণ করতে পারছে না সরকারি স্কুলগুলো? এটা কেবলই অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নিশ্চয়ই নয়।
সরকারি স্কুলগুলো কি শিশুদের খেলাধুলা, গান-নাচ, ছবি আঁকা তথা আনন্দময় ও সৃজনশীল কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা দেয়ার কথা তা দিতে পারছে? শিশুদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার শিশুবান্ধব যানবাহনের ব্যবস্থা কি আছে? স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত প্রশ্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা কি নিশ্চিত আছে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। এর কারণ বহুলাংশেই তদারকির অভাব। সরকারি স্কুলের অবকাঠামো ও উপকরণের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। বেশিরভাগ শিক্ষক তাদের গৃহীত প্রশিক্ষণের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন না পাঠদানে। এই সংকটগুলোর উত্তরণ না হলে সরকারি স্কুল কখনোই ভালো স্কুল বা স্মার্ট স্কুল হিসেবে অভিভাবকদের পছন্দের তালিকায় আসবে না। এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে হবে। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন বা ভিন্ন নামে চালু কথিত স্মার্ট স্কুল গুলো কতটা কাঙ্খিত চাহিদা পূরণ করছে, কতটা মানসম্মত শিক্ষা দিচ্ছে সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। ওইসব স্কুলগুলোর বৈধতা, স্কুলে কী কী পড়ানো হয়, শিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের বেতন এসব কিছুর ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা-নৈরাজ্য বন্ধ হবে না, বাস্তবায়িত হবে না সরকারের লক্ষ্য।

  • [১]