সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী পাঁচ বছর পর পর সরকারি চাকুরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল ও স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির অনুমতি নেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোন কর্মচারীই এসব নিয়ম মানছেন না। তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দাখিলের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি পাঠিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল ও হালনাগাদকরণের পিছনে কেন অবহেলা কাজ করে তা বুঝা দুঃসাধ্য বিষয় বটে। তবে যখন একেবারে নি¤œপদস্ত কোন কর্মচারীর অঢেল সম্পদের হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় তখন এর পিছনে সরকারি পদ-পদবী ব্যবহার করে অনৈতিক লেনদেনে জড়িত হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতেই তারা এমন অবহেলা করেন বলে অনুমান করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণপ্রশাসন নিয়ে জনগণের অভিযোগের অন্ত নেই। প্রশাসনের নি¤œস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত এই অভিযোগ কার্যকর। কিছু কিছু অফিস আছে যেখানে পদায়ন হলে সরকারী কর্মচারীরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যান। দুর্নীতি এখন বাংলাদেশে কোন গোপন চর্চার বিষয় নয়। বরং দুর্নীতি করার মধ্যে এক ধরনের বাহাদুরী লক্ষ করা যায়। যে যত বেশি দুর্নীতি করতে পারেন তার সামাজিক ঠাট-বাট বেশি হয়ে থাকে। এরকম এক সময়ে বহুবিস্তৃত দুর্নীতিকে উপড়ে ফেলতে হলে আইনের শাসন ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না।
অবাধে ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের সুযোগ বিদ্যমান থাকাকে দুর্নীতি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। সভ্য সমাজে এ ধরনের সম্পদ আহরণের কোন সুযোগ নেই। একজন ব্যক্তি যিনি মাসে ত্রিশ হাজার টাকা বেতন পেয়ে ওই টাকা থেকে পরিবার পরিজন প্রতিপালন করার পরও কোটি টাকা দামের ভবন তৈরি করেন, ফ্লাট কিনেন, ব্যাংকে স্থায়ী আমানত গঠন করেন; তখন তাকে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয় নাÑ এসব বিনিয়োগের অর্থ তিনি কী উপায়ে আহরণ করলেন। বড় আমলাদের বিদেশে অর্থ পাচার ও বাড়ি কেনার ঘটনাগুলো তো আরও উচ্চস্তরের। যেসব দেশে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা রয়েছে সেসব দেশে এমনভাবে সম্পদ আহরণ করার কথা চিন্তাই করা যায় না। অথচ দেশে যথাযথ আইনের কোন অভাব নেই। অভাব শুধু সদিচ্ছা ও আইন প্রতিপালনের জন্য একটি নিবেদিত কাঠামো। সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখী করা গেলেই অবাধ দুর্নীতিপ্রবণতা কমতে বাধ্য। কারণ দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত নগদ টাকাকে সম্পদে পরিণত করতে না পারলে সেই টাকা আর সাদা কাগজের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য থাকে না।
দেরিতে হলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, এজন্য তাদেরকে অভিনন্দন। তবে বিষয়টি শুধু কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। কিংবা যেনতেনভাবে একটি প্রতিবেদন দাখিল হলো আর সেটিকে ফাইলে চাপা দিয়ে রাখা হলো; তাহলেও কাজের কাজ কিছু হবে না। দরকার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীয় সত্যাসত্য যাচাই করা এবং আইনের বিধান মোতাবেক নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এ তালিকা হালনাগাদ করা। সম্পদ বিবরণীতে অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করা গেলেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু এই একটি জায়গায় ভালভাবে কাজ করলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যেতে বাধ্য।
শুধু সরকারী কর্মচারী নয়, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীদেরও এমন আইনের আওতায় আনা উচিৎ। এসব বিষয় নিয়মিত তদারকী করতে একটি শক্তিশালী ও ক্ষমতায়িত কর্তূপক্ষ দরকার যারা নির্মোহভাবে নিয়মিত বিষয়গুলোর তদারকী করবেন। দেশে ভয়াল বিস্তৃত দুর্নীতিকে রোধ করতে চাইলে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথগুলোকে অবশ্যই নজরদারীর মধ্যে রাখতে হবে।