নজরুল ইসলাম বাসন
হাসান শাহরিয়ার নামের সঙ্গে পরিচয় সেই সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে। করাচির ডেইলি ডন পত্রিকার চাকরি ছেড়ে লন্ডন হয়ে ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে যান। তিনি চাইলে বিবিসিতে চাকরি নিয়ে লন্ডনে থেকে যেতে পারতেন; কিন্তু তিনি দেশেই ফিরে গিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেছেন, দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল তার জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত। ঢাকা ফিরে গিয়ে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি চিফ রিপোর্টার ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক পর্যন্ত হয়েছিলেন।
সম্ভবত ১৯৮৯ সালের দিকে ঢাকা ক্লাবে শাহরিয়ার ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা, রাজপুত্রের মতো চেহারা। চোখে চশমা। হাস্যোজ্জ্বল মুখ, পরিচয় দিতেই চিনে ফেলেন। কথা শুরু হলো, লন্ডনের শাহগীর বখত ফারুক ভাই, মুকিম আহমদ ভাই, হিমাংশুদার কথা জিজ্ঞেস করলেন। এক পর্যায়ে অপরাধীর মতো বললাম, আপনার অনুমতি না নিয়ে আপনার রিপোর্ট ছাপাই। হেসে বললেন, যাহ্ এতে কী হয়েছে, এখন থেকে আর তোমার অনুমতির প্রয়োজন হবে না। সম্মানীর কথা বলতে সাহস হয়নি। কারণ আমি জানি, শাহরিয়ার ভাই সুনামগঞ্জের বনেদি ঘরের সন্তান, সচ্ছল তো বটেই। তাকে আমরা কতটুকুই-বা সম্মানী দিতে পারব। তিনিও কোনো দিন চাননি, আমরাও দিইনি। ১৯৯৫ সালে আমি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স অফিসার হিসেবে যোগ দিই। সাপ্তাহিক সুরমায় থাকাকালে শাহরিয়ার ভাইর সঙ্গে যোগযোগ খুব বেশি ছিল না, ঢাকা গেলে ইত্তেফাক অফিসে মতি ভাইর (মতিউর রহমান চৌধুরী, কূটনৈতিক রিপোর্টার তখন তিনি) সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। শাহরিয়ার ভাই ব্যস্ত না থাকলে একটা সালাম দিতাম তার রুমে গিয়ে। এ পর্যন্তই। শাহরিয়ার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়ে গেল কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে। অনেক স্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে যে ঘটনা আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছে তা হলো, শাহরিয়ার ভাই ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিলেন সব সিনিয়র সাংবাদিককে। এর মধ্যে ছিলেন প্রয়াত দৈনিক বাংলার কবি ও মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী, ইউএনবির মো. সাঈদ, বাসসের হাবিব উল্লা ও আব্দুর রহমান। আমিনুল হক বাদশা ভাইয়ের সঙ্গে ছিল সবার দহরম-মহরম। প্রতি রাতে শাহরিয়ার ভাইর রুমে তিল ধারণের ঠাঁই হতো না, রাতভর চলত আড্ডা আর আড্ডা। তাদের পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ। হংকংয়ের ওই সম্মেলনেই বাংলাদেশ থেকে প্রথম হাসান শাহরিয়ারই সিজিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন। পরে হাসান শাহরিয়ার ভাই সিজিএর সভাপতি হন।
শাহরিয়ার ভাইর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ২০১২ সালে মাল্টায়। সিজেএর সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে অনেক সাংবাদিক ঢাকা থেকে এসেছিলেন। আড্ডা হতো তখন। আড্ডায় ইনফরমাল অনেক কথা হয়। শাহরিয়ার ভাই কেন অকৃতদার ছিলেন, এ নিয়ে বিবিসির গোলাম কাদের ভাই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছিলেন। রসিক শাহরিয়ার ভাই হেসে হেসে বলেছিলেন, হাম না পুছো, পুছো বুলবুল ছে। মানে হলো আমি প্রেম করেছিলাম কিনা আমাকে জিজ্ঞেস করো না। বুলবুলি পাখিকে জিজ্ঞেস করো। মাল্টা থেকে আমরা লন্ডন চলে এলাম, যে যার দেশে চলে গেলেন। শাহরিয়ার ভাই ছিলেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। তিনি আর চট্টগ্রামের সাংবাদিক ওসমান গনি গেলেন পোল্যান্ড। পোল্যান্ডে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা। শাহরিয়ার ভাইর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতার সিলেট উৎসবে। আমাকে বলেন, জানো বাসন আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি।
শুরুতেই বলেছি, সুদর্শন শাহরিয়ার ভাই শুধু সুদর্শনই ছিলেন না, তার মনটাও ছিল সুন্দর। তার পেশাগত জীবনটাকেও তিনি সুন্দর রেখে গেছেন। করপোরেট হাউসের বিজনেস মিডিয়ার কাছে মাথা বিক্রি না করে শেষ দিন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে পেশার সম্মান রেখেছেন। তিনি তার পদ-পদবি কখনও অর্থের কাছে বিকিয়ে দেননি। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হননি। সিলেটের প্রয়াত নেতাদের মধ্যে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, আব্দুস সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমানের সঙ্গে তিনি সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ইদানীং এই ধরনের পেশাদারিত্ব বিরল। ১৯৪৬ সালের ২৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ২০২১ সালের ১০ এপ্রিল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।
লেখক – লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক
সূত্র : সমকাল